মজুরি বৃদ্ধি ও রেশনিং ব্যবস্থা চালুসহ সাত দফা দাবিতে চট্টগ্রামে কমিউনিটি সেন্টার ও ডেকোরেটার্স শ্রমিকদের মিছিল, মানববন্ধন ও সমাবেশ
![]()
চট্টগ্রাম, ১৮ অক্টোবর ২০২৬: মজুরি বৃদ্ধি, রেশনিং ব্যবস্থা চালু, উৎসব বোনাসসহ সাত দফা দাবিতে চট্টগ্রামে মিছিল, মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছেন জেলা ও মহানগর কমিউনিটি সেন্টার ও ডেকোরেটার্স শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা।
আজ রোববার সকাল ১১টায় সংগঠনের উদ্যোগে কাজীর দেউড়ি কাঁচাবাজার প্রাঙ্গণে শ্রমিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে লাল পতাকায় সজ্জিত একটি বিশাল মিছিল নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে এসে শেষ হয়। পরে সেখানে মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধন চলাকালে অনুষ্ঠিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি মোঃ পারভেজ এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক মোঃ শাহিন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি), চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত।
সংগঠনের নেতাদের মধ্যে বক্তব্য দেন মোঃ শরিফুল ইসলাম, মোঃ শাহ আলম, জাহাঙ্গীর আলম, জালাল উদ্দিন, মোঃ সেলিম, আল আমিন, ইসমাইল গনি, মোঃ খলিলুর রহমান, মোঃ মোতালেব, মোঃ করম, মোঃ শফিউল, মোঃ সবুজ ও মোঃ দেলোয়ার।
বিভিন্ন বেসিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মোঃ হানিফ, হোটেল সেন্ট মার্টিন কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মোঃ মিজানুর রহমান এবং ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশ (ইনসাব), চট্টগ্রামের প্রচার সম্পাদক আবুল বশর।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খান, টিইউসি কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠক ফজলুল কবির মিন্টু এবং বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মোঃ আব্দুর রহিম।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, কমিউনিটি সেন্টারগুলোর ভাড়া ১৫–২০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২–৩ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠান পরিচালনায় যাঁদের শ্রম ও ঘাম অপরিহার্য, সেই শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি মাত্র ৪০০ টাকা। নিয়মিত কাজ না থাকায় এ খাতের অনেক শ্রমিকের মাসিক আয় পাঁচ হাজার টাকাও হয় না। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবের উল্লেখ করে তাঁরা বলেন, বর্তমানে চার সদস্যের একটি পরিবারের ন্যূনতম মাসিক ব্যয় ৩০ হাজার টাকার বেশি। এ অবস্থায় সামান্য মজুরিতে শ্রমিকদের পক্ষে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
বক্তারা প্রশ্ন তুলে বলেন, কমিউনিটি সেন্টারের ভাড়া বাড়াতে মালিকপক্ষের কোনো সমস্যা হয় না, অথচ শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর প্রশ্ন এলেই সমস্যা দেখা দেয় কেন? কমিউনিটি সেন্টারের ওয়েটারদের মজুরি যখন অনুষ্ঠানের আয়োজক বা পার্টির কাছ থেকে দেওয়া হয়, তখন তাঁদের মজুরি বৃদ্ধিতে বাধা কোথায়? শ্রমিকেরা জানতে চান, অনুষ্ঠানের ভাড়া ও অন্যান্য খরচ বাড়ানো সম্ভব হলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি বাড়ানো সম্ভব হবে না কেন? শ্রমিকদের শ্রমের ওপর নির্ভর করেই যখন এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা পরিচালিত হয়, তখন তাঁদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার দায়িত্বও মালিকপক্ষকে নিতে হবে।
তাঁরা বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ন্যায্যমূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা করা হলে শ্রমিক পরিবারগুলো কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে শুধু মজুরি বৃদ্ধিই নয়, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে কার্যকর সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাও প্রয়োজন।
বক্তারা আরও বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ঘরভাড়া, বিদ্যুৎ ও পানির দাম ক্রমাগত বাড়লেও শ্রমিকেরা চার বছর আগে নির্ধারিত মজুরিতেই কাজ করছেন। বছরের প্রায় অর্ধেক সময় কাজ না থাকায় তাঁদের অভাব ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হয়। বিশেষ করে রমজান ও বর্ষাকালে কাজ কমে যাওয়ায় শ্রমিক পরিবারের সংকট আরও তীব্র হয়। এ পরিস্থিতিতে মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মহীন মৌসুমে শ্রমিকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সমাবেশ থেকে সাত দফা দাবি তুলে ধরে বক্তারা বলেন, কমিউনিটি সেন্টার শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ন্যূনতম ৭০০ টাকা এবং ডেকোরেটার্স শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ন্যূনতম ৮০০ টাকা নির্ধারণ করতে হবে। দাবিনামা অনুযায়ী আগামী ১ নভেম্বর ২০২৬ থেকে বর্ধিত মজুরি কার্যকর করতে হবে। পাশাপাশি দুই ঈদে ২০ দিনের মজুরির সমপরিমাণ দুটি উৎসব বোনাস দিতে হবে।
তাঁদের অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে—শ্রমিকদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু, রমজান ও বর্ষাকালে কাজ কম থাকায় বিশেষ প্রণোদনা প্রদান, চার ব্যাচের বেশি কাজের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রতিটি ব্যাচের জন্য বাড়তি মজুরি এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনুষ্ঠানে লগ্নের কাজে দ্বিগুণ মজুরি প্রদান। এ ছাড়া মহান মে দিবসে শ্রমিকদের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ওই দিন কমিউনিটি সেন্টার ও ডেকোরেটার্স প্রতিষ্ঠানে কোনো বুকিং না নেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
শ্রমিক নেতারা বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি তাঁদের শ্রমের ন্যায্য প্রাপ্য। মালিকপক্ষকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার বাস্তবতা বিবেচনা করে মানবিক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সাত দফা দাবি মেনে নিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য তাঁরা মালিকপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।
সমাবেশ থেকে শ্রমিকদের জীবন-জীবিকার সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করা হয়। একই সঙ্গে ন্যায্য মজুরি, রেশনিং ব্যবস্থা ও অন্যান্য অধিকার আদায়ে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানানো হয়।