যে গল্পগুলো লেখা হয়নি-১৮: ফজলুল কবির মিন্টু

অসংখ্য আসমা প্রতিনিয়ত অন্যায়-অবিচারের শিকার হচ্ছে

ডিসেম্বর, ২০২২।

একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে আয়োজিত শ্রমিকদের একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রশিক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলাম। প্রশিক্ষণ চলছিল শ্রমিকদের অধিকার ও চাকরি অবসানজনিত পাওনা নিয়ে। একপর্যায়ে এসব পাওনার হিসাব বোঝানোর সময় একজন বয়স্ক নারী শ্রমিক নিজের জীবনের কথা তুলে ধরলেন। তাঁর নাম আসমা খাতুন।

আসমা জানালেন, বয়স বেশি হওয়ার কারণে প্রায় দুই বছর আগে তাঁকে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তিনি চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড়ে অবস্থিত একটি সুপ্রতিষ্ঠিত পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার সময় তাঁকে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি। পাননি চাকরি অবসানজনিত ক্ষতিপূরণ কিংবা অর্জিত ছুটির টাকাও।

আমি জানতে চাইলাম, তাঁর কাছে নিয়োগপত্র বা পরিচয়পত্র আছে কি না।

কোনোটিই নেই।

চাকরি হারানোর পর প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেছে। তাঁর অভিযোগের পক্ষে প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণও হাতে নেই। ফলে তাঁকে কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, তা নিয়ে আমি অনিশ্চয়তায় পড়ে গেলাম।

যখন বুঝতে পারলাম, আসমাকে সহযোগিতা করার মতো কোনো উপাদান আমার হাতে নেই, তখন তাঁর চাকরির বয়স জিজ্ঞাসা করার ইচ্ছাটুকুও হারিয়ে গেল। কত বছর তিনি কাজ করেছেন, তা জানলে হয়তো তাঁর পাওনার হিসাব করা যেত; কিন্তু সেই পাওনা আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ ও কাগজপত্র না থাকায় প্রশ্নটি করেও তাঁকে নতুন কোনো আশার আলো দেখাতে পারব না—এমনটাই মনে হয়েছিল।

শ্রমিকদের আইনগত অধিকার নিয়ে প্রশিক্ষণ দিই, ন্যায্য পাওনা আদায়ে কাজ করি। অথচ সেদিন আমার সামনেই বসে থাকা একজন নারী শ্রমিক তাঁর প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাঁর কষ্টের কথা শুনেও কার্যকর কোনো সহায়তা দিতে পারলাম না। দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিল না।

সেদিন আসমার কথা মনে গভীর দাগ কেটেছিল। জীবনের মূল্যবান সময় একটি প্রতিষ্ঠানে শ্রম দিয়ে কাটানোর পর বয়স বেড়ে যাওয়ায় তাঁকে চাকরি হারাতে হয়েছে। অথচ দীর্ঘদিনের শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত পাওনাগুলোও তিনি পাননি।

আসমা খাতুন কি একাই এমন অন্যায়ের শিকার?

আমার অভিজ্ঞতা বলে, না। বাংলাদেশের বিভিন্ন পোশাক কারখানা ও অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত অসংখ্য শ্রমিক এমন বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে নারী শ্রমিকেরা বয়স কিংবা অন্য কোনো অজুহাতে চাকরি হারিয়ে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হন। অনেকে জানেন না তাঁদের অধিকার কী, আবার কেউ কেউ অধিকার সম্পর্কে জানলেও প্রতিকার পাওয়ার পথ খুঁজে পান না।

নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র কেবল কিছু কাগজ নয়; চাকরির সম্পর্ক প্রমাণ এবং শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এগুলো না থাকলে চাকরির প্রমাণ দেওয়া ও পাওনা আদায়ের লড়াই অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। তাই শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিশ্চিত করা এবং চাকরি অবসানের ক্ষেত্রে আইন মেনে চলা নিয়োগকর্তার দায়িত্ব।

আসমার ঘটনাটি আমাকে আবারও ভাবিয়েছে—আইনে অধিকার থাকলেই তা বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা, কর্মক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং অভিযোগের কার্যকর নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

কতজন শ্রমিক চাকরি হারিয়ে প্রাপ্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন? কতজন নারী শ্রমিক বয়সের অজুহাতে কর্মস্থল থেকে বিতাড়িত হচ্ছেন? কতজন প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবে ন্যায়বিচারের সুযোগ হারাচ্ছেন? এসবের হিসাব কি আমরা রাখি?

আসমা খাতুনের জন্য কিছু করতে না পারার আক্ষেপ আজও রয়ে গেছে। তাঁর গল্পটি শুধু একজন শ্রমিকের ব্যক্তিগত বঞ্চনার কাহিনি নয়; এটি শ্রম অধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতারও প্রতিচ্ছবি।

আসমা খাতুনরা যেন আর নীরবে হারিয়ে না যান। প্রতিটি শ্রমিকের শ্রমের মূল্য আছে, মর্যাদা আছে, অধিকার আছে। বয়স বেড়ে যাওয়া কিংবা চাকরি হারানোর অর্থ তাঁর অধিকার হারিয়ে যাওয়া নয়।

হয়তো এই লেখা আসমার হারানো পাওনা ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু তাঁর মতো অসংখ্য শ্রমিকের না-বলা কষ্ট ও বঞ্চনার কথা সমাজের সামনে তুলে ধরতে পারবে—এটাই প্রত্যাশা।

যে গল্পগুলো লেখা হয়নি, সেগুলো লিখে রাখা জরুরি। কারণ, এই গল্পগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের শ্রমজীবী মানুষের জীবনের অনেক না-বলা সত্য।