যে গল্পগুলো লেখা হয়নি–১৩
মামলায় যাওয়ার আগেই হালিমা পেল তার প্রাপ্য
![]()
২০ মার্চ ২০২৩ এক আনন্দঘন দিন। ঐদিন হালিমার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে তার চাকরি অবসানজনিত প্রাপ্য টাকা। একটি দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হলো। আরেকজন শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য পাওনা ফিরে পাওয়ার গল্পে যুক্ত হলো ছোট্ট একটি সাফল্য।
হালিমা তখন মানসিকভাবে অসুস্থ। বড় বোনের সঙ্গে থাকত। সেই কঠিন সময়ে সংসপ্তকের চাকরি করতেন দীপ্তি দিদি। হালিমার অসহায় অবস্থার কথা জেনে তিনি তাকে আমার কাছে পাঠান।
হালিমার কথা শুনে মনে হলো, তার পাশে দাঁড়ানো দরকার। প্রথমেই কর্তৃপক্ষের কাছে তার পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে একটি গ্রিভ্যান্স দরখাস্ত লিখে দিলাম।
কিন্তু শুধু দরখাস্ত করেই থেমে থাকিনি। বিষয়টি জানালাম সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্কিত একটি দৈনিক পত্রিকার চট্টগ্রাম অফিসের একজন সাংবাদিক বন্ধুকে। তিনি বিষয়টি শুনে সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন।
এরপর শুরু হলো আরেকটি চেষ্টা—মামলা নয়, আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা।
আমাদের দেশে শ্রম আইনে প্রতিকারের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে সেই প্রতিকার পেতে একজন শ্রমিককে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। আইনে শ্রম মামলা ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে নিষ্পত্তি সম্ভব না হলে যথাযথ কারণ উল্লেখ করে বিচারক আরও ৯০ দিন সময় বাড়াতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা অনেক কঠিন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে শ্রম মামলা নিষ্পত্তি হতে গড়ে পাঁচ থেকে সাত বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
একজন অসহায় শ্রমিকের জন্য পাঁচ বছর, সাত বছর অপেক্ষা করা কতটা কঠিন—তা কেবল ভুক্তভোগীই জানেন।
তাই আমরা চেষ্টা করি, মামলা করার আগে সম্ভাব্য সব পথ কাজে লাগাতে। আলোচনা, মধ্যস্থতা, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ—যে পথেই শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা আদায় করা সম্ভব, সেই পথটি আগে চেষ্টা করি।
হালিমার ক্ষেত্রেও ঠিক সেটিই করা হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ সফল হয়েছে। ২০ মার্চ ২০২৩ কর্তৃপক্ষ হালিমাকে তার প্রাপ্য টাকা বুঝিয়ে দিয়েছে।
এই পাওনা আদায়ের পেছনে নেপথ্যে সহযোগিতা করেছেন আমার এক সাংবাদিক বন্ধু। তার আন্তরিক সহযোগিতা ও মধ্যস্থতার কারণেই ভুক্তভোগী শ্রমিক হালিমার টাকা আদায় করা সম্ভব হয়েছে। তাকে জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।
হালিমার হাতে যখন তার পাওনা টাকা তুলে দেওয়ার খবর পেলাম, তখন মনে হলো—শ্রমিকের অধিকার আদায়ের লড়াই শুধু মামলা-মোকদ্দমার লড়াই নয়; কখনো কখনো মানবিকতা, আন্তরিকতা, সহযোগিতা ও সম্মিলিত উদ্যোগও একজন শ্রমিককে তার ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারে।
হালিমার গল্প হয়তো খুব বড় কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু তার কাছে এই টাকাটুকুই ছিল অনেক কিছু।
একজন শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য পাওনা ফিরে পাওয়ার আনন্দই আমাদের পথচলার প্রেরণা।
শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের এই লড়াইয়ে সবার সহযোগিতা কামনা করছি।