চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা ‘স্থবির’ ছিল—নৌমন্ত্রীর বক্তব্য বাস্তবতাবিবর্জিত: বন্দর রক্ষা কমিটি
![]()
চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা ‘স্থবির পর্যায়ে’ ছিল এবং সেই স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে আনার পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে—নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের এমন বক্তব্যকে বাস্তবতাবিবর্জিত ও বিভ্রান্তিকর বলে মন্তব্য করেছে বন্দর রক্ষা কমিটি চট্টগ্রাম।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার ও সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম ‘স্থবির’ ছিল—এমন দাবি কোনোভাবেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে বন্দর শ্রমিক-কর্মচারী, কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও দেশীয় দক্ষ জনশক্তির নিরলস শ্রম, অভিজ্ঞতা ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় চট্টগ্রাম বন্দর তার কার্যক্রম সচল রেখেছে এবং কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ধারাবাহিকভাবে সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে।
তারা বলেন, বৈরী আবহাওয়া, সমুদ্রের সতর্ক সংকেত ও নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বন্দর শ্রমিক-কর্মচারীরা ঝুঁকি নিয়ে বন্দরের কার্যক্রম সচল রেখেছেন। চট্টগ্রাম বন্দরের আয় ও হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি থাকলেও সেটিকে ‘স্থবিরতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা বাস্তবতার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। বন্দরের এই অর্জনের পেছনে শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রম ও দক্ষতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বন্দর রক্ষা কমিটির নেতৃবৃন্দ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি ও সক্ষমতা সম্প্রসারণ অবশ্যই প্রয়োজন। তবে উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক কনটেইনার টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদি ইজারার মাধ্যমে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।
তারা বলেন, বিদেশি প্রযুক্তি, কারিগরি জ্ঞান বা ব্যবস্থাপনা সহযোগিতা গ্রহণের বিরোধিতা বন্দর রক্ষা কমিটির নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি ও দক্ষতা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অবকাঠামোর কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জাতীয় অর্থনীতি, নিরাপত্তা, শ্রমিকস্বার্থ, রাজস্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ওপর এর প্রভাব প্রকাশ্যে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বিবৃতিতে তারা আরও বলেন, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনালের (সিসিটি) মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অতীত সরকারের সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত কিংবা পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে নেওয়া উদ্যোগ—কোনোটিই জনস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে হতে পারে না।
তারা বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে বন্দরের প্রকৃত সক্ষমতা, আয়, কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং এবং দেশীয় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা নিয়ে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রকাশ করা প্রয়োজন।
বন্দর রক্ষা কমিটির নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘‘আমরা বন্দরের আধুনিকায়ন চাই, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন চাই, সক্ষমতা বৃদ্ধি চাই; কিন্তু জাতীয় স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বিসর্জন দিয়ে নয়। চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন দেশের শ্রমিক-কর্মচারী, কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও দেশীয় দক্ষ জনশক্তিকে সঙ্গে নিয়েই করতে হবে।’’
তারা জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক স্থাপনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বাতিল এবং বন্দরের জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের দাবিতে চলমান আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। আগামী ৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের সামনে দিনব্যাপী অবস্থান কর্মসূচিসহ ধারাবাহিক কর্মসূচি আরও জোরদার করা হবে।