যে গল্পগুলো লেখা হয়নি–৪ -ফজলুল কবির মিন্টু
![]()
ভুক্তভোগী যখন আসামি!!
চট্টগ্রাম ইপিজেডের একটি পোশাক কারখানার ঘটনা। নারী শ্রমিকটির নাম কল্পনা আক্তার—ছদ্মনাম।
আমার সঙ্গে তার আগে কোনো পরিচয় ছিল না। কোনো এক শ্রমিকের কাছ থেকে আমার মোবাইল নম্বর পেয়ে একদিন ফোন করেছিল। জানাল, কর্তৃপক্ষ তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে।
ঘটনাটি ৮ জুন ২০২৩ সালের। তার সুপারভাইজার ফোন করে ছুটির পর তার সঙ্গে সময় কাটাতে চেয়েছিলেন। কল্পনা জবাবে বলেছিল, “আজকে সময় নাই, পরে দেখা করব।”
এই কথাটিই শেষ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ‘অপরাধ’ হয়ে দাঁড়ায়।
১৩ জুলাই দেওয়া নোটিশে তার আচরণকে ‘উশৃঙ্খল ও অশালীন’ উল্লেখ করে ‘বেপজা আইন ২০৪-এর ২’ এবং একটি অফিস আদেশের ৩-এর চ ও ছ ধারায় শাস্তিযোগ্য বলা হয়।
নোটিশটি পড়ে আমার প্রথম প্রশ্ন ছিল—‘বেপজা আইন’ আবার কোন আইন?
বাস্তবে ‘বেপজা আইন’ নামে কোনো শ্রম আইন নেই। সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের জন্য প্রযোজ্য আইন হলো ইপিজেড শ্রম আইন, ২০১৯।
তবে আইনের নামের ভুলের চেয়েও বড় বিষয় ছিল—একজন পুরুষ সুপারভাইজার একজন নারী শ্রমিককে ফোন করে ব্যক্তিগতভাবে সময় কাটানোর প্রস্তাব দিলেন, আর সেই প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় নারী শ্রমিকটিই হয়ে গেল ‘অশালীন’!
আমার কাছে মনে হলো, বিষয়টি ইপিজেড শ্রম আইন, ২০১৯-এর ১৮৯ ধারার আলোকে তদন্তের দাবি রাখে। অথচ সুপারভাইজারের আচরণ তদন্তের পরিবর্তে তদন্তের মুখোমুখি করা হচ্ছে নারী শ্রমিককে।
কল্পনা আমার কাছে আসার আগেই কারণ দর্শানোর জবাব দিয়েছিল। সেখানে সে শুধু নোটিশের উত্তর দেয়নি; দীর্ঘদিন ধরে সুপারভাইজারের হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণও দিয়েছিল।
কর্তৃপক্ষ অবশ্য বিষয়টি সেভাবে আমলে নিল না। তারা তদন্তের উদ্যোগ নিল এবং কল্পনাকে তার পক্ষের প্রতিনিধি মনোনয়ন দিতে বলল। মানবসম্পদ বিভাগ থেকে ওয়ার্কার্স পার্টিসিপেটরি কমিটি থেকে দুজনের নাম দিতে বলা হলো।
কল্পনা আমার পরামর্শ চাইল।
ইপিজেডের বাস্তবতা বিবেচনা করে আমার মনে হলো, এভাবে প্রতিনিধি দিলে বিষয়টি তার পক্ষে নাও যেতে পারে। তাই উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও ইপিজেড শ্রম আইনের আলোকে বিষয়টি যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটিতে পাঠানোর জন্য কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখে দিলাম।
একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ইপিজেডে কর্মরত আমার পূর্বপরিচিত কয়েকজন কাউন্সিলরকেও বিষয়টি জানালাম।
এটা ছিল এক ধরনের কৌশল। কারণ ইপিজেডের কোনো শ্রমিকের পক্ষে বাইরে থেকে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া সহজ নয়। আমি শুধু চেয়েছিলাম কর্তৃপক্ষ বুঝুক—
কল্পনা একা নয়।
কর্তৃপক্ষ কয়েকবার তদন্ত কমিটি গঠনের চেষ্টা করল এবং পার্টিসিপেটরি কমিটি থেকে প্রতিনিধি দেওয়ার জন্য তাকে বোঝাতে থাকল। শেষ পর্যন্ত তারা ওই কমিটি থেকেই দুজনকে নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করল।
আমি কমিটির ব্যাপারে অনাস্থা জানিয়ে রেজিস্টার্ড ডাকযোগে চিঠি দিলাম।
এরপর আর বিষয়টি বেশি দূর এগোয়নি।
শেষ পর্যন্ত কল্পনার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহার করা হলো এবং তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হলো।
পরে জানতে পারলাম, ফ্লোরে মেয়েটির সঙ্গে ভয়ে আর কেউ কথাও বলত না। তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কথায় কথায় তাকে বলতেন—
“তোমার হাত অনেক লম্বা।”
কিন্তু সত্যিই কি তার হাত লম্বা ছিল?
না।
সে শুধু নিজের বিরুদ্ধে করা ষড়যন্ত্র থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিল। চেয়েছিল, তার কথাটুকু কেউ শুনুক।
এই ঘটনার সবচেয়ে নির্মম দিক ছিল—হয়রানির অভিযোগ করা নারী শ্রমিককেই হয়রানির জবাবদিহির মুখোমুখি করা।
একজন পুরুষ সুপারভাইজার ফোন করলেন।
একজন নারী শ্রমিক অস্বস্তি প্রকাশ করলেন।
আর শেষ পর্যন্ত ‘দোষী’ হয়ে গেলেন সেই নারী শ্রমিকই!
আমার দীর্ঘ শ্রমিক-অধিকার জীবনে এমন ঘটনা আমাকে বারবার একটি কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে—
ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো শ্রমিককে একা করে দিতে পারলেই অন্যায় অনেক সহজ হয়ে যায়।
কল্পনা একা ছিল না বলেই শেষ পর্যন্ত তার চাকরি ফিরে এসেছিল।
কিন্তু প্রশ্নটি থেকে যায়—
ভুক্তভোগী যখন আসামি হয়ে যায়, তখন শুধু একজন শ্রমিকই পরাজিত হয় না; পরাজিত হয় ন্যায়বিচারের ধারণাটিও।