আগস্ট ২৪, ২০২৬

ফেরদৌস স্টিলে নিহত ১০ শ্রমিকের পরিবারকে ৭ লাখ টাকা করে সহায়তা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিতে বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে নিহত ১০ শ্রমিকের পরিবারকে ৭ লাখ টাকা করে সহায়তা দিয়েছে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ।

রবিবার (২৩ আগস্ট) জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নিহত শ্রমিকদের পরিবারের হাতে এই সহায়তার অর্থ তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহেদুল ইসলাম মিয়া উপস্থিত ছিলেন।

ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের দেওয়া ৭ লাখ টাকার পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচটি পরিবারকে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিল থেকে আরও ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। বাকি পাঁচ পরিবার নিজ নিজ জেলার প্রশাসনের কাছ থেকে একই পরিমাণ অর্থ পাবে বলে জানান জেলা প্রশাসক।

দুর্ঘটনার পরপরই নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ ১ লাখ টাকা করে দিয়েছিল। এছাড়া শ্রম আইন অনুযায়ী প্রত্যেক নিহত শ্রমিকের জন্য আরও ২ লাখ টাকা করে শ্রম আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে পরিবারগুলোকে ভবিষ্যতেও সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ।

অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক জাহেদুল ইসলাম মিয়া বলেন, কোনো ক্ষতিপূরণই একটি জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে না। তবে সরকার ও শিল্পসংশ্লিষ্টরা নিহত শ্রমিকদের পরিবারের পাশে রয়েছে এবং সুযোগ হলে আরও সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

জাহাজভাঙা শিল্পে শূন্য মৃত্যুহার চায় সরকার

জেলা প্রশাসক বলেন, বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্প গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

তিনি বলেন, “আমরা চাই, এই খাতে হতাহতের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে।”

এ জন্য উন্নত প্রযুক্তি, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

জেলা প্রশাসক স্বীকার করেন, দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজের ভেতরে উচ্চমাত্রার হাইড্রোজেন সালফাইড তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার মতো প্রযুক্তিগত সক্ষমতা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ছিল না। ঘটনার পর বিশেষজ্ঞ দল এনে বিষাক্ত গ্যাস অপসারণ এবং জাহাজটি নিরাপদ করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করা হয়।

তিনি বলেন, প্রযুক্তি, জ্ঞান ও দক্ষতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে যেতে হবে।

একই সঙ্গে এলএনজি, গ্যাসসহ বিপজ্জনক পদার্থ বহনকারী জাহাজ বাংলাদেশে আমদানি ও পুনর্ব্যবহারের আগে আরও কঠোরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার আহ্বান জানান তিনি।

জাহাজটির ভেতরে কীভাবে হাইড্রোজেন সালফাইড জমেছিল এবং গ্যাসমুক্ত সনদ থাকার পরও কেন তা শনাক্ত করা যায়নি, তা খতিয়ে দেখতে কয়েকটি সরকারি সংস্থা তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্তে কারও অবহেলা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান জেলা প্রশাসক।

দুর্ঘটনার দায় শুধু ইয়ার্ডের নয়: বিএসবিআরএ

বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন চৌধুরী বলেন, দুর্ঘটনার দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুধু স্থানীয় জাহাজভাঙা ইয়ার্ডের ওপর দেওয়া উচিত নয়।

তার মতে, একটি জাহাজ পুনর্ব্যবহারের জন্য বিক্রি করার আগে সেটি যথাযথভাবে পরিষ্কার ও নিরাপদ করার দায়িত্ব আগের জাহাজমালিকের।

তিনি জানান, পরিদর্শন প্রক্রিয়ার নথিপত্রে জাহাজটি বিক্রির আগে পরিষ্কার করা হয়েছিল বলে উল্লেখ ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে আসার পর জাহাজটির ভেতরে বিপজ্জনক গ্যাস পাওয়া যায়।

জাহাজটি বাংলাদেশে বিক্রির আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে বিএসবিআরএ। কীভাবে গ্যাস জাহাজের ভেতরে থেকে গেল এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজ যাতে বাংলাদেশে পুনর্ব্যবহারের জন্য না আসে, তা নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য বলে জানান তিনি।

নিহত শ্রমিকদের পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মহসিন চৌধুরী বলেন, শুধু শ্রমিকদের নয়, তাদের সন্তানদের পাশেও সংগঠনটি থাকবে।

নিহতদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চাইলেন ফেরদৌস ওয়াহিদ

ফেরদৌস স্টিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস ওয়াহিদ নিহত শ্রমিকদের পরিবারের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

তিনি জানান, তার বাবা আলহাজ মোহাম্মদ লোকমান হাজী ১৯৯৫ সালে জাহাজভাঙা ব্যবসায় প্রবেশ করেন। ২০২১ সালে বাবার মৃত্যুর পর তিনি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেন।

নিহতদের মধ্যে ফোরম্যান মনসুর ও সিনিয়র কাটার নাসির প্রায় ১৮ বছর ধরে ইয়ার্ডটিতে কাজ করছিলেন বলে জানান তিনি।

ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, তারা তার সহকর্মী ছিলেন এবং তাদের সঙ্গে তার কখনো কোনো বিরোধ হয়নি।

তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি পরিবেশবান্ধব ও দায়িত্বশীল জাহাজ পুনর্ব্যবহার সুবিধা গড়ে তোলার চেষ্টা করে আসছে এবং বর্তমানে তাদের দুটি গ্রিন শিপইয়ার্ড রয়েছে।

“আমাদের কোনো ভুল হয়ে থাকলে ফেরদৌস স্টিল পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি,” বলেন তিনি।

ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

গ্যাসমুক্ত সনদ নিয়েও প্রশ্ন

গত ১৪ আগস্ট ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রির একটি জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংক থেকে পানি অপসারণের সময় বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে ৯ শ্রমিক নিহত এবং অন্তত ৬ জন আহত হন।

ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর বিস্ফোরক পরিদপ্তরের পরীক্ষায় জাহাজটির ভেতরে প্রতি মিলিয়নে ১০ দশমিক ৮ অংশ (পিপিএম) হাইড্রোজেন সালফাইড পাওয়া যায়। কর্মকর্তাদের ধারণা, দুর্ঘটনার সময় গ্যাসটির ঘনত্ব ১০০ পিপিএমের বেশি ছিল।

গ্যাসের উপস্থিতিতে জাহাজের ভেতরে লিক পরীক্ষা করতে প্রবেশ করা শ্রমিকেরা আক্রান্ত হন। পরে সহকর্মীদের উদ্ধারে জাহাজে প্রবেশ করা কয়েকজন শ্রমিকও বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

ঘটনার পর একাধিক তদন্ত শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে নজরদারি শুরু হয়েছে।

বিশেষ করে গ্যাসমুক্ত সনদের কার্যকারিতা, বিপজ্জনক জাহাজ ব্যবস্থাপনা এবং আবদ্ধ স্থানে শ্রমিক প্রবেশের আগে বিষাক্ত গ্যাস শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।