সম্পাদকীয় | প্রগতির যাত্রী

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের হাসপাতালগুলোর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এবং নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ)-এ ওষুধ-প্রতিরোধী (অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্ট) ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ উদ্বেগজনক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) দুটি গবেষণার ফলাফল আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বহু রোগী নতুন করে এই প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন এবং এ ধরনের সংক্রমণে মৃত্যুহার ৯০ শতাংশেরও বেশি।
এই তথ্য শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা। মানুষ হাসপাতালের দ্বারস্থ হয় সুস্থ হওয়ার আশায়। কিন্তু যদি হাসপাতালই নতুন সংক্রমণের উৎসে পরিণত হয়, তবে তা শুধু রোগীর জীবনকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে না, বরং গোটা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বহুদিন ধরেই অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সকে (এএমআর) বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশেও নিয়ন্ত্রণহীন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন, হাসপাতালের অপর্যাপ্ত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জীবাণুমুক্তকরণে ঘাটতি এবং অতিরিক্ত রোগীর চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আইসিডিডিআরবির গবেষণায় উঠে এসেছে যে, আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার সময় যেসব রোগীর শরীরে প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া ছিল না, তাঁদের একটি বড় অংশ চিকিৎসাধীন অবস্থায় নতুন করে সংক্রমিত হয়েছেন। এটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, হাসপাতালের ভেতরে সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় এখনও গুরুতর দুর্বলতা রয়েছে। বিশেষ করে সংকটাপন্ন রোগী, নবজাতক, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেবল চিকিৎসকদের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে হবে না। এটি একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যনীতি ও প্রশাসনিক দায়িত্বের বিষয়। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাকে কঠোর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ নীতি অনুসরণ করতে হবে। চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুমুক্তকরণ, হাত ধোয়ার বাধ্যতামূলক সংস্কৃতি, পর্যাপ্ত আইসোলেশন ব্যবস্থা, নিয়মিত নজরদারি এবং হাসপাতালভিত্তিক অ্যান্টিবায়োটিক স্টুয়ার্ডশিপ কর্মসূচি কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি বন্ধ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। গবেষণাগার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং হোল-জিনোম সিকোয়েন্সিংসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ালে সংক্রমণের উৎস দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ আরও কার্যকর হবে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের এই নীরব মহামারি সেই অর্জনকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। আজ যে সতর্কবার্তা গবেষণা থেকে এসেছে, তা অবহেলা করার সুযোগ নেই। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণও এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক আর কোনো কাজ করবে না।
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই হাসপাতালকে অবশ্যই আরোগ্যের নিরাপদ স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, সংক্রমণের কেন্দ্র হিসেবে নয়। নীতিনির্ধারক, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সাধারণ জনগণ—সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই এই ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। এখনই সময় বিজ্ঞানভিত্তিক, দায়িত্বশীল ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের।
