হাসপাতালে কমছে না হামের রোগী, মৃত্যু ছাড়াল ৪৫১
দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় চার হাজার শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি থাকছে। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু টিকাদান নয়, সচেতনতা বৃদ্ধি, আইসোলেশন ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় বিশেষ উদ্যোগ নিলেই রোগীর চাপ অনেকটা কমানো সম্ভব।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ৪০ হাজার ১৭৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছে ৩৬ হাজার ৫৫ জন। অর্থাৎ বর্তমানে সারা দেশে ৪ হাজার ১২১ জন হামের রোগী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। হাসপাতালের বাইরে আরও অনেক রোগী বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ১ মে হাসপাতালে ভর্তি রোগী ছিল ৩ হাজার ৪৫০ জন, ৭ মে ছিল ৩ হাজার ৬৭৪ জন এবং গতকাল তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ১২১ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) পরিচালক অধ্যাপক আবু আহমেদ আল মামুন বলেন, সারা দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে পৃথকভাবে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না।
রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে রোগীর চাপ এখনো অনেক বেশি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৪ মে পর্যন্ত সেখানে ৬৪৮ শিশু ভর্তি হয়েছে। শুধু ১৪ মে হাসপাতালটিতে ভর্তি ছিল ৮৫ শিশু। হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মো. মাহবুবুল হক বলেন, সাধারণ শয্যায় রোগীর চাপ কিছুটা কমলেও আইসিইউতে চাপ এখনো উদ্বেগজনক।
এদিকে রাজধানীর সরকারি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হামের রোগীর জন্য মাত্র ১০টি শয্যা থাকলেও গতকাল সেখানে ভর্তি ছিল ৫৪ জন রোগী।
সরকার উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় ৫ এপ্রিল থেকে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ওইসব এলাকায় সংক্রমণ কিছুটা কমেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, কোরবানির ঈদের ছুটিতে মানুষের চলাচল ও শিশুদের মেলামেশা বাড়লে সংক্রমণ আবারও বাড়তে পারে।
সরকারি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এফ এ আসমা খান বলেন, আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে অনেক শিশু সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। ঈদের সময় শিশুদের অবাধ মেলামেশা সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।
জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের পাশাপাশি ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ জরুরি। রোগতত্ত্ববিদ ও আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, সব রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। হালকা উপসর্গের রোগীদের বাড়িতে আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া যেতে পারে। তিনি নিয়মিত হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার এবং হাসপাতালে আলাদা হাম কর্নার চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে জ্বর ও র্যাশযুক্ত রোগীদের আলাদা করতে হবে, আইসোলেশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করতে হবে এবং দর্শনার্থীর সংখ্যা সীমিত করতে হবে।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে আরও ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চার শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছিল এবং আটজনের মধ্যে হামের উপসর্গ ছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে ৩৭৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে আরও ৭৪ শিশু। সব মিলিয়ে দেশে হামে ও হামের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫১ জনে।
