মাতৃত্ব কি অপরাধ? -৭ বছরের লড়াই শেষে শ্রমিক ফিরোজা আক্তারের ন্যায়ের বিজয় -ফজলুল কবির মিন্টু
-ফজলুল কবির মিন্টু
ফিরোজা আক্তার ১০ অক্টোবর ২০১৭ সালে টি কে ফুট ওয়্যার লিঃ-এ নার্স হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। নিষ্ঠা, দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে তিনি দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। কিন্তু ২০১৯ সালে তিনি অন্তঃসত্তা হওয়ার পরই তাঁর জীবনে নেমে আসে নির্মম বৈষম্য ও নির্যাতনের অধ্যায়।
মাতৃত্ব যেন তাঁর জন্য “অপরাধ” হয়ে দাঁড়ায়। কর্তৃপক্ষ পরিকল্পিতভাবে সাজানো অভিযোগ এনে ২০ মার্চ ২০১৯ তারিখে তাঁর বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ তোলে। ফিরোজা যথাযথভাবে অভিযোগের জবাব দিলেও তা গ্রহণ না করে তাঁকে দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে বেআইনিভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
এই অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মাথা নত না করে ফিরোজা বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্ট-এর সহযোগিতায় চট্টগ্রাম শ্রম আদালত-এ মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ প্রায় ৭ বছরের কঠিন লড়াই, হয়রানি, আর্থিক ও মানসিক চাপ সহ্য করার পর অবশেষে তিনি ন্যায়বিচার পেয়েছেন।
মাননীয় আদালত ফিরোজার চাকরির ধারাবাহিকতা বহাল রেখে তাঁকে চাকরিতে পুনর্বহাল, ২০১৯ সাল থেকে বকেয়া বেতন প্রদান এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধা (Maternity Benefit) দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এই রায় শুধু একজন শ্রমজীবী নারীর বিজয় নয়, এটি দেশের সকল কর্মজীবী নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেরও প্রতীক।
শ্রম আইনে ৬০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির নির্দেশনা থাকলেও বিশেষ কারণে অতিরিক্ত ৯০ দিন সময় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। অথচ ফিরোজার ক্ষেত্রে একটি ন্যায়সঙ্গত রায় পেতে লেগে গেছে প্রায় ৭ বছর। এই দীর্ঘসূত্রিতা আমাদের শ্রম বিচারব্যবস্থার বাস্তব চিত্রকে সামনে নিয়ে আসে। বিচার পেতে যদি বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়, তবে অনেক শ্রমিকই ন্যায়বিচারের আশা হারিয়ে ফেলেন।
ফিরোজাকে আইনি পরামর্শ প্রদান, কারণ দর্শানো নোটিশের জবাব লিখে দেওয়া, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্ট-এর মাধ্যমে মামলা দায়ের করানো এবং আইনি দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ফিরোজা হতাশ হয়ে পড়লে তাঁকে সাহস ও মানসিক শক্তি জোগানোর মতো কাজে সহযোগিতা করতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। একজন অসহায় নারী শ্রমিকের ন্যায়বিচারের সংগ্রামে পাশে দাঁড়াতে পারা নিঃসন্দেহে মানবিক ও নৈতিক দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আজ ফিরোজা মামলায় জয়ী হলেও তাঁর শঙ্কা এখনো কাটেনি। আপিল, রিট ও আইনি জটিলতার বেড়াজালে তাঁকে আরও কতদিন অপেক্ষা করতে হবে, তা হয়তো একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন। তবুও ফিরোজার এই সংগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহস নিয়ে দাঁড়ালে, দীর্ঘ সময় লাগলেও ন্যায়বিচার অর্জন সম্ভব।
একটি সভ্য সমাজে মাতৃত্ব কোনো অপরাধ হতে পারে না। একজন নারী শ্রমিক সন্তানসম্ভবা হওয়ার কারণে চাকরি হারাবেন—এমন বাস্তবতা শুধু অন্যায়ই নয়, মানবিক মূল্যবোধেরও চরম অবমাননা। তাই কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মাতৃত্বকালীন অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, আদালত এবং সমাজের সকল স্তরের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
(লেখকঃ বিলস চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সমন্বয়ক এবং টিইউসি কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠক)

