চলমান সংবাদ

চীন সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার

বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের আড়াই মাসের মাথায় প্রথমবারের মতো চীন সফরে গেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিন দিনের এই রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা থাকলেও তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তার পানি বণ্টন সমস্যা এবং নদী ব্যবস্থাপনা সংকট সমাধানে চীনের সহায়তায় নেওয়া ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’ বাস্তবায়নে এবার নতুন করে উদ্যোগ নিতে চায় সরকার।

চীন সফরে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, “এটা আমাদের ওই অঞ্চলের মানুষের মরণ-বাঁচনের বিষয়। এটা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার এবং সরকারেরও অঙ্গীকার। আমরা এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে চাই এবং চীন সফরে বিষয়টি অবশ্যই আলোচনায় থাকবে।”

দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সংকট

তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী, যা হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতের সিকিম, দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ভারতের অংশে একাধিক ব্যারেজ নির্মাণের কারণে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে পানির প্রবাহ কমে যায়। ফলে রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধাসহ তিস্তাপারের বিস্তীর্ণ এলাকায় খরা ও কৃষি সংকট দেখা দেয়।

অন্যদিকে বর্ষাকালে ভারত হঠাৎ অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিলে আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ নদীভাঙনের সৃষ্টি হয়। এতে প্রতিবছর হাজারো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন।

‘তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ’-এর সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানী বলেন, “শুকনো মৌসুমে যখন আমাদের পানি দরকার তখন ভারত পানি দেয় না। আবার বর্ষায় একসঙ্গে এত বেশি পানি ছাড়ে যে মানুষ ভিটেমাটি হারায়।”

কী আছে তিস্তা মহাপরিকল্পনায়

চীনের সহায়তায় প্রস্তাবিত তিস্তা মহাপরিকল্পনায় রয়েছে—

  • বাংলাদেশ অংশের উজানে বহুমুখী ব্যারেজ নির্মাণ
  • ১০২ কিলোমিটার নদী খনন ও গভীরতা বৃদ্ধি
  • ২০৩ কিলোমিটার প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ
  • ১৭১ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার
  • নদীতীরে স্যাটেলাইট শহর, পর্যটন কেন্দ্র ও হোটেল নির্মাণ
  • ১৫০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন

প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। এর বড় অংশই ঋণ সহায়তার মাধ্যমে আসার কথা।

ভারত-চীন প্রতিযোগিতার কেন্দ্র তিস্তা

তিস্তা প্রকল্প ঘিরে ভারত ও চীনের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, চীন তাদের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে এই প্রকল্পে আগ্রহী।

অন্যদিকে ভারত মনে করে, তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা দক্ষিণ এশিয়ায় বেইজিংয়ের প্রভাব আরও বাড়াবে। এ কারণে দিল্লিও প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে।

২০২৪ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তিস্তা প্রকল্পে ভারতের অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবারও চীনের দিকে ঝুঁকেছে ঢাকা।

পানি চুক্তির দাবিও জোরালো

বিশ্লেষক ও আন্দোলনকারীরা মনে করছেন, শুধু মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলেই হবে না, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যাও নিশ্চিত করতে হবে।

২০১১ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হলেও পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নতুন করে চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। তবে এ বিষয়ে এখনও নিশ্চিত কিছু জানা যায়নি।

এদিকে সরকার বলছে, পানি চুক্তির জন্য অপেক্ষা না করে নিজেদের কাজ এগিয়ে নিতে হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, “চুক্তি হবে কি না সেটা নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। আমাদের কাজ আমাদের করতে হবে।”