চলমান সংবাদ

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতার জোরালো সম্ভাবনা, হরমুজ প্রণালি খুলতে পারে শিগগিরই

দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত অবসানের পথে এগোচ্ছে বলে জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর লক্ষ্যে একটি ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে তেহরান ও ওয়াশিংটন। এই সমঝোতা কার্যকর হলে পরবর্তী ধাপে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির জন্য আলোচনায় বসবে দুই দেশ।

এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র বুধবার রয়টার্সকে জানিয়েছে, দুই পক্ষ দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে। একই ধরনের তথ্য প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসও।

এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জানিয়েছেন, আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ায় ইরানের বিরুদ্ধে ঘোষিত “প্রজেক্ট ফ্রিডম” অভিযান স্থগিত করা হয়েছে। এই অভিযান ছিল হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ভাঙার উদ্দেশ্যে নেওয়া সামরিক পদক্ষেপ।

সমঝোতার সম্ভাবনার খবরে বিশ্ববাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যুদ্ধের কারণে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ১২০ ডলারের ওপরে উঠলেও বুধবার তা আবার ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ছয় হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি এবং মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাব তেহরান পর্যালোচনা করছে এবং দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে ইরানের তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, মার্কিন প্রস্তাবে কিছু “অগ্রহণযোগ্য” বিষয় রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনায় অগ্রগতি স্পষ্ট। সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক আবাস আসলানি আল-জাজিরাকে বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তির পথ খুলে দিয়েছে।

৩০ দিনের আলোচনায় চূড়ান্ত চুক্তির পরিকল্পনা

খসড়া সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, যুদ্ধ বন্ধের পর ৩০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্যে আলোচনায় বসবে দুই দেশ। পাকিস্তানের ইসলামাবাদ অথবা সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এ বৈঠক হতে পারে।

অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে খসড়া স্মারক নিয়ে আলোচনা করছেন।

স্মারকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দফা হলো—ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার করবে। তবে কোনো পক্ষ চুক্তি লঙ্ঘন করলে যুক্তরাষ্ট্র আবার সামরিক হামলা শুরু করতে পারবে বলে উল্লেখ রয়েছে।

পড়ুন:  ইরান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, কূটনীতির সুযোগ নেই: কামাল খারাজি

পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন সমঝোতার চেষ্টা

ইরানের পরমাণু কর্মসূচিই ছিল যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ। পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, ইরান উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে। যদিও তেহরান বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

খসড়া সমঝোতা অনুযায়ী, ইরান নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখবে এবং পরমাণু অস্ত্র না তৈরির প্রতিশ্রুতি দেবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে এবং জব্দ থাকা প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার ফেরত দেবে।

সূত্রগুলো বলছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখার সময়সীমা নিয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের সময়সীমা চাইলেও ইরান পাঁচ বছরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সমঝোতার একটি সম্ভাব্য মেয়াদ ১২ থেকে ১৫ বছর হতে পারে বলে আলোচনা চলছে।

লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থামার পথে গেলেও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা পুরোপুরি কমছে না। ইসরায়েল এখনো লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ লেবাননের টায়ার ও খিরবেত সেলমসহ বিভিন্ন এলাকায় বুধবারও হামলা হয়েছে, যাতে কয়েকজন নিহত হয়েছেন।

এ পর্যন্ত লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ২ হাজার ৭০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ইসরায়েল দাবি করছে, তারা হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

হরমুজ চালু হলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটছে না

বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান এই পথ বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে তেলের দামে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়।

বর্তমানে সমঝোতার ফলে হরমুজে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরবে না। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১৪০টি জাহাজ এই প্রণালি ব্যবহার করত। এখন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর হলেও দুই পক্ষের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনে সময় লাগবে। তাই হরমুজ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে ধাপে ধাপে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে।