চলমান সংবাদ

সংসদে শপথ ঘিরে নতুন বিতর্ক: জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন

সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের দিন থেকেই দেশে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের সূচনা হয়েছে। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া–না নেওয়া নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্ন অবস্থান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

পটভূমি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। পরবর্তীতে সংবিধান সংস্কার কমিশনসহ একাধিক কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়, যার প্রধান ছিলেন ড. ইউনূস এবং সহ-সভাপতি ছিলেন আলী রীয়াজ

৩৩টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার পর চূড়ান্ত হয় ‘জুলাই সনদ’। ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে। পরে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জুলাই সনদ-সংক্রান্ত চারটি প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়।

তবে গণভোটের বৈধতা ও জুলাই সনদের কার্যকারিতা চ্যালেঞ্জ করে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে একাধিক রিট দায়ের হয়েছে।

শপথ নিয়ে বিভক্ত অবস্থান

জামায়াত ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপির সংসদ সদস্যরা তা নেননি। বিএনপির দাবি—সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো বিধান নেই; তাই এ ধরনের শপথ নেওয়ার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাও নেই।

এনসিপির আহ্বায়ক ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ ছাড়া বর্তমান সংসদের কোনো মূল্য নেই।

আইন বিশ্লেষকদের মত

সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো অস্তিত্ব নেই। ফলে বিএনপির সংসদ সদস্যরা শপথ না নিয়ে সংবিধান লঙ্ঘন করেননি। তার মতে, সংসদই সংবিধান সংশোধনের একমাত্র ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান; আলাদা পরিষদের প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তিনি গণভোট প্রক্রিয়াকেও আইনগতভাবে অস্পষ্ট বলে মন্তব্য করেন।

সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার শরীফ ভূঁইয়া বলেন, জনগণ সংবিধানের ঊর্ধ্বে। জনগণ চাইলে সংবিধান পরিবর্তন বা নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে পারে। তার মতে, জুলাই সনদ ও গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। এখন সংবিধানের দোহাই দিয়ে শপথ এড়িয়ে যাওয়া জনআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থি হতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, পরিস্থিতি সাংবিধানিক সংকট না তৈরি করলেও রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

সামনে কী?

জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী দলগুলোর মধ্যেই মতভেদ থাকায় এর বাস্তবায়ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে। সংসদের অধিবেশন শুরু হলে এই বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের আশাবাদ ব্যক্ত করছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দ্বন্দ্বের মূল প্রশ্ন এখন সংবিধানের প্রাধান্য নাকি গণভোট-সমর্থিত রাজনৈতিক অঙ্গীকার—এই বিতর্কের মধ্যেই নির্ধারিত হবে দেশের সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ।