জনমত উপেক্ষা করে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির উদ্যোগ
এনসিটি ইজারা ইতিহাসে ‘কালো চুক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত হবে: বন্দর রক্ষা কমিটি
![]()
চট্টগ্রাম, ৮ অক্টোবর ২০২৬: চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ১৫ বছরের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগের তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছে বন্দর রক্ষা কমিটি চট্টগ্রাম। কমিটির নেতারা বলেছেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ নিয়ে জনগণের মতামত উপেক্ষা করে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার এক বিবৃতিতে এ ক্ষোভ জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের নামে প্রচারিত আমন্ত্রণপত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (PPP) আওতায় এনসিটি প্রকল্প নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের কথা জানানো হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ডিপি ওয়ার্ল্ড ১৫ বছর এনসিটি পরিচালনা করবে এবং ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে মাশুল আদায় করবে। বিনিময়ে বন্দর কর্তৃপক্ষকে এককালীন অর্থ ও কনটেইনারপ্রতি মাশুল দেওয়ার কথা রয়েছে।
তবে প্রস্তাবিত চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত, আর্থিক কাঠামো, পরিচালনাগত অধিকার, রাষ্ট্রের দায় এবং শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কে এখনো জনসমক্ষে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কমিটি।
বিবৃতিতে নেতারা বলেন, উন্নয়ন ও বিদেশি বিনিয়োগের কথা বলে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি চুক্তি জনগণের কাছ থেকে গোপন রেখে সম্পাদনের উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের জনগণের সম্পদ এবং এই সম্পদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে জনগণের মতামত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তারা আরও বলেন, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার হলেও জাতীয় সম্পদ বিষয়ে জনগণের মতামত উপেক্ষা করে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার সরকারের নেই। জনগণের আপত্তি অগ্রাহ্য করে চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া হলে তা নিয়ে জনমনে যে ক্ষোভ তৈরি হবে, তার দায় সরকারকেই বহন করতে হবে।
বন্দর রক্ষা কমিটি চট্টগ্রাম অবিলম্বে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া স্থগিত করার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত প্রকাশ, চুক্তির আর্থিক ও কারিগরি দিক সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং শ্রমিক, বন্দর ব্যবহারকারী, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও জনগণের মতামত গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।
কমিটির নেতারা বলেন, জাতীয় স্বার্থ, বন্দরের ওপর রাষ্ট্রের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নে কোনো আপস করা যাবে না।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জনমত উপেক্ষা করে চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে এর বিরুদ্ধে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। এনসিটি ইজারা চুক্তি শেষ পর্যন্ত ‘কালো চুক্তি’ হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হবে বলেও মন্তব্য করেন তারা।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। ২০০৮ সালে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে তা বাতিল হয়। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রক্রিয়াটি নতুন করে শুরু হয়। ২০১৯ সালে আবুধাবিতে এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই এবং ২০২৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়ন এবং দর-কষাকষির পর্যায়ে যায় প্রক্রিয়াটি। পরে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তা আবার এগিয়ে যায়। সর্বশেষ ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এনসিটি ১৫ বছরের জন্য বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালনার রেয়াতি চুক্তির খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন করে।
বন্দর রক্ষা কমিটির নেতারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো কৌশলগত ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে শুধু চুক্তি সম্পাদন নয়, চুক্তির প্রতিটি শর্তে জাতীয় স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আয়, বন্দর নিরাপত্তা এবং শ্রমিকদের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত হচ্ছে—তা জনগণের সামনে পরিষ্কার করা জরুরি।
তারা বন্দর ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় শ্রমিক-কর্মচারীসহ সর্বস্তরের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।