সারসংকট নিয়ে সংসদে বিতর্ক: মজুত পর্যাপ্ত দাবি সরকারের, বিতরণব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন বিরোধী দলের

সারসংকট নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক হয়েছে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে দাবি করা হলেও বিরোধী দল প্রশ্ন তুলেছে, মজুত থাকার পরও কৃষকেরা সার পাচ্ছেন না কেন। সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় সরকারের ব্যর্থতা, কারখানা বন্ধ রেখে বেশি দামে সার কেনা এবং সম্ভাব্য খাদ্যসংকটের ঝুঁকি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

আজ বুধবার বিরোধী দলের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমানের নোটিশের ওপর আলোচনায় এই বিতর্ক হয়। ‘দেশজুড়ে তীব্র সারসংকটে কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়া; কৃষকদের মাঝে বিরাজমান আতঙ্ক এবং সম্ভাব্য খাদ্যসংকটের ঝুঁকি নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ’ বিষয়ে আলোচনার জন্য কার্যপ্রণালিবিধির ৬৮ বিধিতে নোটিশটি দেন তিনি।

আলোচনায় নাজিবুর রহমান বলেন, সরকার সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। সার কারখানাগুলো বন্ধ রেখে জনগণের টাকায় বেশি দামে সার কেনা হচ্ছে। সরকার মজুত থাকার কথা বললেও সেই সার কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে না কেন, সেটিই মূল প্রশ্ন।

সরকারের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জ্বালানিসংকট যখন শুরু হলো, তখনো কিন্তু আমাদের বলা হয়েছিল দেশে কোথাও লোডশেডিং নেই। এখন কি আমরা ওনাদের বিশ্বাস করব, নাকি অবিশ্বাস করব?’

জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, দেশে সার পর্যাপ্ত থাকার দাবি করা হলেও কৃষকেরা ন্যায্যমূল্যের চেয়েও বেশি টাকা দিয়ে সার পাচ্ছেন না। এ প্রসঙ্গে তিনি সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন তুলে ধরেন। সারসংকটের মধ্যে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত গোডাউন ভর্তি থাকার অভিযোগ এবং ডিলার নিয়োগে বাণিজ্যের অভিযোগও তিনি সংসদে তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘আবার সেই ২০০১–২০০৬ সালের সিনড্রোম (লক্ষণ)। যখন এক বস্তা সারের পরিবর্তে কৃষককে গুলির মুখে জীবন দিতে হয়েছে।’

আলোচনায় জামায়াতের আরেক সংসদ সদস্য মাহবুবুল আলম বলেন, চলমান সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশে খাদ্যসংকট তৈরি হতে পারে। সরকারের তথ্য অনুযায়ী অতিরিক্ত সার মজুত রয়েছে, তাহলে কৃষকেরা সার পাচ্ছেন না কেন—এ প্রশ্ন তোলেন তিনি।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী ও রৌমারীতে কৃষকদের গুদাম লুটের ঘটনা এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় সারের জন্য কৃষকদের অসন্তোষের কথাও সংসদে তুলে ধরেন মাহবুবুল আলম। তাঁর অভিযোগ, মজুত থাকার পরও কৃষকদের মধ্যে যে হাহাকার তৈরি হয়েছে, তা সরকারের ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। কালোবাজারি রোধ, ডিলারদের সিন্ডিকেট ভাঙা এবং কৃষকের কাছে সার পৌঁছানো নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

সরকারি দলের জবাব

সরকারি দলের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, স্বৈরাচার সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া অনেক ডিলার এখনো বহাল আছেন। অনেকে পলাতক। বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ৭৫৯টি সারের ডিলার পয়েন্ট শূন্য রয়েছে। বিতরণে যাতে সমস্যা না হয়, সে জন্য প্রত্যেক ইউনিয়নে একজন করে নতুন ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, স্বৈরাচার আমলে নিয়োগ পাওয়া ডিলাররা বিভিন্নভাবে সরকারকে হেয় করার চেষ্টা করছেন এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছেন। এটি আর করতে দেওয়া হবে না।

ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সারের মজুতের পরিসংখ্যান তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, গত বছর মজুত অনেক কম ছিল। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও মিয়ানমারে সারের দাম বেশি হওয়ায় কিছু সার সেখানে পাচার হওয়ার প্রবণতার তথ্য প্রশাসনের কাছে রয়েছে। এ ধরনের দুটি ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন বলেন, সার ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে ৬৪টি জেলায় ৬৪টি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। কোথাও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের পরিবর্তনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন শূন্য পদে ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সুলতান সালাউদ্দিন বলেন, বর্তমানে দেশে সারের মোট পরিমাণ ৫১ দশমিক ৭১ লাখ মেট্রিক টন। চাহিদা মেটানোর পরও ১৫ দশমিক ৮৪ লাখ মেট্রিক টন উদ্বৃত্ত থাকবে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত ২০–২২টি বিশেষ এলাকার ছোটখাটো সমস্যাকে ভিত্তি করে অসন্তোষ ছড়ানোর অপচেষ্টা চলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শরিফুল আলম শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য তুলে ধরে বলেন, দেশে পর্যাপ্ত সার উৎপাদন, আমদানি ও মজুত রয়েছে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) উৎপাদিত ও আমদানি করা সার কারখানা ও বাফার গুদামে রাখে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অনুযায়ী তা ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়।

তিনি জানান, বর্তমানে বিসিআইসির সাতটি সার কারখানার মধ্যে ঘোড়াশাল, পলাশ ও শাহজালাল সার কারখানা উৎপাদনে রয়েছে। চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড গ্যাস পাওয়ার পর উৎপাদন শুরুর প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

শরিফুল আলম বলেন, দেশে সারের পর্যাপ্ত উৎপাদন, আমদানি ও মজুত রয়েছে। সংকট তীব্র নয়, সার আছে। তবে ব্যবস্থাপনায় কিছু ত্রুটি থাকতে পারে।