বিজন ভাবনা

বিজন ভাবনা(৫৬): তসলিমা নাসরিন   – বিজন সাহা

কথায় বলে যে সব ভালো যার শেষ ভালো। হ্যাঁ, দিনের শেষে মানুষ শেষ ফল দেখেই কোন কিছুর ভালো মন্দ বিচার করে। ছাত্রজীবনে লেখাপড়ায় যতই অমনোযোগী হোক না কেন কর্ম জীবনে কেউ সফল হলে মানুষ সেটাই  মনে রাখে। এই যে আমরা চব্বিশ পরবর্তী ঘটনার জন্য বামপন্থীদের এত সমালোচনা করি তার মূল কারণ দেশ উল্টো পথে হাঁটছে। কিন্তু যদি চব্বিশের পটপরিবর্তনের ফলে দেশে সত্যি সত্যি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হত, দেশ একাত্তরের প্রতিশ্রুতি পালনের পথে এগিয়ে যেত, তাহলে এই আমরাই এরকম মাস্টার স্ট্রোকের জন্য তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতাম। তাছাড়া আমরা সবাই নিজের নিজের মানসিক, আদর্শিক ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে কোন ঘটনা বিচার করি। ২০২৪ পরবর্তী দেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য নিশ্চয়ই বাম দলগুলো একা দায়ী নয়। এমনকি বলা যায় তাদের শক্তি এতটাই নগণ্য যে একক প্রচেষ্টায় ভালো বা মন্দ করার সামর্থ্য তাদের নেই, ছিল না। তবে অনুঘটক হিসেবে তারা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যেটা তারা রেখেছে। জেনেশুনে বা অজ্ঞাতসারে তারা আন্দোলনকে একটি প্রগতিশীল, দেশপ্রেমিক, ধর্মনিরপেক্ষ রূপ দিয়েছে যার কাঁধে ভর করে জামায়াত শিবির তাদের এজেন্ডা সফল করেছে। দেশ ধ্বংসে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখার পরেও আমরা কিন্তু জামায়াত শিবিরের ততটা সমালোচনা করি না যতটা করি সিপিবি, উদীচী ও অন্যান্য বামপন্থী সংগঠনের। কারণ জামায়াত শিবিরের কাছ থেকে আমরা ভালো কিছু আশা করি না। তবে বামপন্থীরা একাত্তরের অর্জনগুলো ধরে রাখবে এটা শুধু আশা নয়, এটা আমাদের দাবি। একই ভাবে তসলিমা নাসরিন যেকোনো ধরনের মৌলবাদী শক্তি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখবেন এটাই আমরা চাই। তাই তাঁর কোলকাতা প্রত্যাবর্তন নিয়ে আজ এত বিতর্ক।

২০১০ সালে আমরা বাংলাদেশ প্রবাসী পরিষদ রাশিয়া নামে একটি সংগঠন সৃষ্টি করি। পয়লা বৈশাখ, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এসবের মধ্য দিয়ে সুদূর প্রবাসে নিজেদের সংস্কৃতি চর্চা ছিল আমাদের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। কোন কোন শিল্পীরা বলত
– দাদা, আমাদের শ্রোতারা তো রবীন্দ্র সংগীত খুব একটা শুনতে চায় না। এটা বাদ দেই?
– আমি বলতাম “দেখ তারা শুধু যে রবীন্দ্র সংগীত শোনে না বা শোনেনি তা নয়, এদের অনেকেই হয়তোবা রবীন্দ্রনাথের নাম পর্যন্ত জানে না। আমাদের সংগঠনের উদ্দেশ্য শুধু মানুষকে বিনোদন দেয়া নয়, আমাদের উদ্দেশ্য তাদের গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক আদর্শের কথা জানানো। তারা বাসায় রবীন্দ্র সংগীত শোনে না, কিন্তু আমাদের মাধ্যমে যদি তাঁর নাম জানে, গান শুনে আর বাসায় গিয়ে শুনতে চায় সংগঠন হিসেবে সেটাই হবে আমাদের পরম পাওয়া। প্ল্যাটফর্মের কোন ধর্ম বা আদর্শ নেই, সেখান থেকে যা প্রচার করা হয় সেটাই ঐ সময়ের জন্য তার আদর্শ।”

দীর্ঘ উনিশ বছর পর তসলিমা নাসরিন কোলকাতা ফিরলেন। এর আগে ১৯৯৪ সালে তিনি দেশ থেকে বিতাড়িত হন লজ্জা উপন্যাসের জন্য। এই উপন্যাসে তিনি বাংলাদেশে হিন্দুদের জীবনের করুণ বাস্তবতা নিয়ে লিখেছেন। এরপরে দ্বিখণ্ডিত লেখার জন্য তিনি কোলকাতা থেকেও বহিষ্কৃত হন ইসলামী মৌলবাদীদের চাপে। আর বহিস্কার করে বাম ফ্রন্ট সরকার।

১৯৯৬ সালে দুই মাসের জন্য ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার পর থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স বা আইসিটিপি যাই গবেষণার  কাজে। সেবার সাথে ছিল দস্তইয়েফস্কির “মৃত্যুপুরীর চিরকুট”, সলঝেনিৎসিনের “ক্যান্সার ওয়ার্ড” ও “দেনিস ইভানোভিচের এক দিন”। মৃত্যুপুরীর চিরকুট পড়া শেষ হলে ক্যান্সার ওয়ার্ড ধরলাম। কিন্তু দস্তইয়েফস্কির পরে সলঝেনিৎসিনের ভাষা এতটাই দরিদ্র মনে হচ্ছিল যে কয়েকদিন একেবারেই এগুতে পারিনি। দস্তইয়েফস্কির লেখায় ভাষার যে সৌন্দর্য আছে, আছে মানুষের সাইকোলজিক্যাল বিশ্লেষণ সলঝেনিৎসিনের লেখায় তা নেই। তাঁর লেখার মূল প্রতিপাদ্য ষাটের দশকের সোভিয়েত ইউনিয়নের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। দুই জনের লক্ষ্য একেবারেই ভিন্ন। তাই বলে সলঝেনিৎসিনের লেখার গুরুত্ব কম নয়। তসলিমা নাসরিন সেদিক থেকে সলঝেনিৎসিনের অনুসারী। তাঁর কাজ সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন বৈষম্য তুলে ধরা। তিনি সেটাই করছেন। ধর্মীয় বা আদর্শিক সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ তো বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। খবরের কাগজ খুললেই প্রতিদিন এসব খবর দেখা যায়। এসব সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে কথা বললে বোঝা যায় কতটা ভয়ের মধ্যে তারা জীবন কাটায়। তসলিমা নাসরিন মানুষের সেই দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতাকে উপন্যাসের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। তিনি যদি মিথ্যা কিছু বলতেন তাহলে না হয় তাঁর বিচার করা যেত, তাঁকে নির্বাসনে পাঠানো যেত। কিন্তু সত্য প্রকাশের জন্য রাষ্ট্র যখন কাউকে দেশত্যাগে বাধ্য করে সেটা তো রাষ্ট্রেরই লজ্জা। রাষ্ট্র সমস্যা সমাধানের পথে না গিয়ে যারা সমস্যা নিয়ে কথা বলে তাদের মুখ বন্ধের পথে গেল। আমাদের দেশে গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতা যে নেই সেটা প্রতিটি বিরোধী দলই বলে, কিন্তু ক্ষমতায় গেলে সবাই সেটা বেমালুম সেটা ভুলে যায়। সমস্যার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার না করা রাষ্ট্রকে বা সমাজকে আর যাই করুক নৈতিকভাবে শক্তিশালী করে না।

পড়ুন:  বিজন ভাবনা(৫৫): চব্বিশের মীরজাফর   -বিজন সাহা

 

পরস্পর নির্ভরশীল এই বিশ্বে কারো ভালো বা মন্দ না করে কিছুই করা যায় না। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও তথ্যপ্রযুক্তিতে বিশ্বায়নের পর প্রতিটি মানুষের প্রতিটি কাজ কারো না কারো জন্য লাভজনক বা ক্ষতিকর হয়। আর যদি এসব লোক সামাজিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয় তাহলে তো কথাই নেই। এটা মেনেই আমাদের চলতে হয়, চলতে হবে। এটা মেনেই নিজের কাজ করতে হবে, নিজের কথা বলতে হবে। বড়লোক মালিক আরও বড়লোক হবে এই যুক্তিতে শ্রমিক যদি মালিকের জন্য কাজ করতে না চায় তাহলে মালিকের অনেক আগে সেই মারা যাবে।

তসলিমা নাসরিন কোলকাতায় এসেছেন। তিনি কোলকাতা এসেছেন বিজেপি সরকারের আমলে। উনিশ বছর আগে সিপিএম সরকার তাঁকে কোলকাতা ত্যাগে বাধ্য করেছিল বা বাধ্য হয়েছিল ইসলামী মৌলবাদীদের চাপের মুখে। তাঁকে কোলকাতা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করে সিপিএম শুধু তাঁকে নয় মুক্তচিন্তাকে, লেখকের লেখার অধিকারকে নির্বাসিত করেছিল, যা বাংলাদেশ করেছিল আরও প্রায় এক যুগ আগে। বিজেপি সরকার এখন ক্ষমতায় বিধায় অনেকেই বলছে তিনি মৌলবাদ এন্ডোর্স করছেন। বিজেপি এ ঘটনাকে নিঃসন্দেহে তার নিজের রাজনৈতিক কাজে লাগাবে। কিন্তু এত বছর নির্বাসনে থেকে দেশে না হলেও নিজস্ব ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে আসতে পারা – একজন মানুষের জীবনে এর গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে তিনি যদি নির্বাসিত হন। মানুষ সামাজিক জীব হলেও তার নিজস্ব সত্তা আছে। ব্যক্তি মানুষ বেঁচে না থাকলে, ব্যক্তি মানুষ ভাল না থাকলে সমাজ ভাল থাকে না। আর প্রতিটি মানুষের জীবন দর্শন, তার ভালো লাগা, মন্দ লাগা ভিন্ন। তাই পাছে বিজেপি লাভবান হয় এই যুক্তিতে আমরা কি তসলিমা নাসরিনের কোলকাতা আসার বিরোধিতা করতে পারি? কই, নিজেদের প্রগতিশীল বলে পরিচয় দেয়া মানুষ যখন ইউরোপ আমেরিকা ভ্রমণ করে, সেসব দেশে তাদের সন্তানরা স্থায়ী ভাবে বসবাস করে তখন তো প্রশ্ন আসে না, কেন আমরা ঘৃণিত পুঁজিবাদের বিকাশে সাহায্য করছি?

 

তাছাড়া নিজের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তসলিমা নাসরিন বুঝিয়ে দিয়েছেন যে কৃতজ্ঞতা স্বীকার বা আমন্ত্রণ গ্রহণ মানে আনুগত্য নয়। আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রথিতযশা লোকজন কোন সরকারের আমলেই তাদের আয়োজিত অনুষ্ঠানে গিয়ে দ্বিমত প্রকাশ করার সাহস বা সুযোগ কোনটাই পান নাই। এমনকি সিপিএম ও মমতা যুগেও সেটা ছিল প্রায় অসম্ভব। এই যে বিজেপি শাসিত পশ্চিম বঙ্গে এসে মৌলবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট উচ্চারণ, এটাই বা কয় জন পারে? এমনকি বিজেপি যদি তসলিমা নাসরিনের আগমন থেকে ফায়দা লুটেও, তারপরেও তাঁর সাহসী বক্তব্য অনেকের মধ্যে মৌলবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে সাহস যোগাবে। এ জন্য হলেও তাঁর কোলকাতা আগমন সার্থক।
আসুন আমরা তসলিমা নাসরিনকে শুধু একজন এক্টিভিস্ট হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে দেখি যার আমাদের মতই দেশ আছে, দেশের প্রতি ভালবাসা আছে, দেশে আসার জন্য অধীর আগ্রহী এক মন আছে। দ্বিমত প্রকাশ করেও যে অনেকটা পথ একসাথে চলা যায় সেটা যেন আমরা ভুলে না যাই।

গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো