গ্যাস–সংকটে শিল্পে নতুন সংযোগ আপাতত বন্ধ, সরবরাহ বাড়াতে বিকল্প খুঁজছে সরকার
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে ক্রমাগত কমছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন, অন্যদিকে বিদ্যমান এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানির সক্ষমতাও সীমিত। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও সার খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তীব্র গ্যাস–সংকট দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আপাতত শিল্পে নতুন গ্যাস–সংযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় গত ১৪ জুলাই বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)-এর চেয়ারম্যানকে পাঠানো এক চিঠিতে জানিয়েছে, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। একই সঙ্গে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নির্ভর আমদানি সীমাবদ্ধ থাকায় নতুন শিল্প সংযোগের বিষয়টি আপাতত বিবেচনা করা হচ্ছে না।
বর্তমানে কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সম্মিলিত সরবরাহ সক্ষমতা দৈনিক ১১০ কোটি ঘনফুট। তবে একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় গত এক সপ্তাহ ধরে দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুটেরও কম গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ, শিল্প ও অন্যান্য খাতে সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
গ্যাস–সংকটের কারণে শিল্পে নতুন সংযোগ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত অবশ্য নতুন নয়। ২০০৯ সালে শিল্প ও বাণিজ্যিক এবং ২০১০ সালে আবাসিক গ্রাহকদের নতুন গ্যাস সংযোগ স্থগিত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সীমিতসংখ্যক সংযোগ দেওয়া হলেও সেসব প্রক্রিয়া নিয়ে নানা সময় দুর্নীতির অভিযোগও ওঠে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত এক দশকে দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ১০০ কোটি ঘনফুটেরও বেশি কমেছে। ২০১৭ সালে দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট, যা পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হলেও বিদ্যমান অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে আমদানি বাড়িয়ে সংকট পুরোপুরি মোকাবিলা করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, শিল্পে নতুন গ্যাস–সংযোগ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত সাময়িক। গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে সরকার একাধিক বিকল্প নিয়ে কাজ করছে। ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা, মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আনা এবং সরবরাহ অবকাঠামো সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে অগ্রাধিকার তালিকার ভিত্তিতে সংযোগ দেওয়া হবে। যাঁরা ইতোমধ্যে অনুমোদন নিয়ে ডিমান্ড নোটের অর্থ জমা দিয়েছেন, তাঁদের আগে বিবেচনা করা হবে।
তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্প সময়ে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হলেও বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে কয়েক বছর সময় লাগে। একইভাবে নতুন এলএনজি টার্মিনাল ও পাইপলাইন নির্মাণেও অন্তত দেড় বছর সময় প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, বর্তমানে মহেশখালী থেকে চট্টগ্রামের আনোয়ারা পর্যন্ত গ্যাস পরিবহনের সক্ষমতা থাকলেও পরবর্তী পাইপলাইনগুলো অপেক্ষাকৃত সরু হওয়ায় দৈনিক ১১০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব নয়। ফলে শুধু নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করলেই হবে না, পাশাপাশি ট্রান্সমিশন অবকাঠামোও সম্প্রসারণ করতে হবে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যবহৃত মোট গ্যাসের ৪১ শতাংশ বিদ্যুৎ খাতে, ৩৬ শতাংশ শিল্পে, ১১ শতাংশ গৃহস্থালি রান্নায়, ৬ শতাংশ সার কারখানায়, ৫ শতাংশ সিএনজি এবং ১ শতাংশ চা শিল্পে ব্যবহৃত হয়। চাহিদা সামাল দিতে এক খাত থেকে অন্য খাতে গ্যাস সরিয়ে সরবরাহের সমন্বয় করতে হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরেই।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, যারা অনুমোদন পাওয়ার পর ব্যাংকঋণ নিয়ে শিল্প স্থাপন করেছেন, তাঁদের দীর্ঘদিন সংযোগ না দিলে অনেকেই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দেউলিয়া হতে পারেন। তাঁর মতে, স্বল্পমেয়াদে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে এলএনজি আমদানির বিকল্প নেই। পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নতুন আমদানি অবকাঠামো নির্মাণে দ্রুত বিনিয়োগ প্রয়োজন।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি সংকট নিরসনে সরকার পর্যায়ক্রমে ১০০টি গ্যাস কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। পাশাপাশি সমুদ্র ও স্থলভাগে নতুন অনুসন্ধান, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে এসব প্রকল্পের সুফল পেতে সময় লাগবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

