চলমান সংবাদ

র‍্যাবের নাম বদলে নতুন বাহিনী গঠনের উদ্যোগ, নতুন আইন প্রণয়নের পথে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) নাম পরিবর্তন করে নতুন নামে বাহিনীটিকে কার্যক্রম চালু রাখার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে পৃথক একটি আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নতুন আইনের অধীনে বাহিনীটির নাম স্পেশাল রেসপন্স ফোর্স (এসআরএফ) অথবা স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) রাখা হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে নতুন আইনের খসড়া নিয়ে আলোচনা হয়। এতে বাহিনীটিকে পুরোপুরি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে আনা, কার্যক্রমের পরিধি এবং সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে মতবিনিময় করা হয়। আগামী ২৯ জুলাই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে আরেকটি বৈঠকে খসড়াটি চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

খসড়া আইনে মোট ৯টি অধ্যায়ে ২৯টি ধারা রাখা হয়েছে। এতে ইউনিটের গঠন, দায়িত্ব, তল্লাশি ও গ্রেপ্তার, ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত, সদস্যদের শৃঙ্খলা ও শাস্তি, অভিযোগ প্রতিকার, প্রশিক্ষণ এবং বর্তমান র‍্যাবের সদস্য, সম্পদ ও চলমান কার্যক্রম নতুন ইউনিটে স্থানান্তরের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

খসড়া অনুযায়ী, নতুন ইউনিটটি বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে পরিচালিত হবে। বাহিনীর মহাপরিচালক হবেন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। তবে বর্তমান র‍্যাবের মতোই পুলিশ ছাড়াও সশস্ত্র বাহিনী ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে সদস্য প্রেষণ বা সংযুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

বাহিনীর কার্যক্রমের এলাকা সারা দেশের পরিবর্তে কেবল মহানগর এলাকায় সীমিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, জেলা পর্যায়ে পুলিশের জনবল সংকট থাকায় সেখানে বিশেষায়িত বাহিনীর কার্যক্রম আরও প্রয়োজন।

নতুন আইনে বাহিনীটির দায়িত্ব হিসেবে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার, মাদকবিরোধী অভিযান, সন্ত্রাসবাদ দমন, সাইবার অপরাধ, মানব পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

খসড়ায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা বহাল রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত পরিচালনার ক্ষমতাও নতুন ইউনিটকে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বাহিনীটি অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি নির্দিষ্ট মামলার তদন্তও করতে পারবে।

পড়ুন:  র‍্যাব বিলুপ্তির দাবির মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত, উঠছে বৈধতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন

এ ছাড়া সদস্যদের বিরুদ্ধে নাগরিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য পাঁচ সদস্যের একটি অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে কমিটির অধিকাংশ সদস্য সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় এর স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মানবাধিকার সংগঠন ও গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন দীর্ঘদিন ধরে র‍্যাব বিলুপ্ত করে কেবল পুলিশের সদস্যদের নিয়ে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের সুপারিশ করে আসছে। তবে নতুন খসড়ায় সামরিক বাহিনীর সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ বহাল থাকায় সেই সুপারিশ পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি।

মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান বলেন, শুধু নাম পরিবর্তন করলেই বাহিনীর সংস্কার হবে না। জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশের, তাই বিশেষ ইউনিটও পুলিশের প্রশিক্ষিত সদস্যদের দিয়েই গঠন করা উচিত। তিনি আরও বলেন, সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত বেসামরিক আইন প্রয়োগের কাজে যুক্ত করলে নাগরিক অধিকার সুরক্ষা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

প্রস্তাবিত আইন কার্যকর হলে ‘র‍্যাব’ নামটি বিলুপ্ত হলেও বাহিনীর সদস্য, স্থাপনা, অস্ত্র, সরঞ্জাম, মামলা, চুক্তি ও দায়দেনা নতুন ইউনিটের অধীনে স্থানান্তর হবে। ফলে সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি কার্যত র‍্যাব বিলুপ্তি নয়; বরং নতুন নামে এবং পৃথক আইনের অধীনে বাহিনীটির পুনর্গঠন।