চলমান সংবাদ

এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রে ভুল: ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ

নিজস্ব প্রতিবেদক

চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় একদিকে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা গ্রহণ, অন্যদিকে পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্রে ভুল এবং কয়েকটি বিষয়ে তুলনামূলক কঠিন প্রশ্নের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পাবলিক পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন ব্যবস্থায় প্রশ্নপত্রে ভুলকে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা “ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ” হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।

সরকার ইতোমধ্যে পদার্থবিজ্ঞান (তত্ত্বীয়) প্রথম পত্রের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল থাকার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে। জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, ভুল হওয়া দুটি প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রশ্নপত্র মডারেশনের দায়িত্বে থাকা চার শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে।

এদিকে ২ জুলাই শুরু হওয়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে একাধিকবার পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রবল বর্ষণের মধ্যেই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় অনেক পরীক্ষার্থীকে কোমরসমান পানি পেরিয়ে কিংবা নৌকায় করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে। এমন পরিস্থিতিকে অমানবিক উল্লেখ করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের একাংশ বিক্ষোভও করেছেন।

পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, করোনা মহামারির দীর্ঘ প্রভাব এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পরও এবারের কয়েকটি বিষয়ের প্রশ্ন তুলনামূলক কঠিন হয়েছে। এতে অনেক শিক্ষার্থী প্রত্যাশিতভাবে পরীক্ষা দিতে পারেননি। যদিও শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, প্রশ্ন সিলেবাসের বাইরে থেকে করা হয়নি এবং মূল পাঠ্যবই অনুসরণকারীদের জন্য প্রশ্ন কঠিন হওয়ার কথা নয়।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশ্ন সহজ বা কঠিন হওয়া নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু প্রশ্নপত্রে ভুল থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ একটি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। প্রশ্ন প্রণয়ন, মডারেশন এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের একাধিক ধাপ অতিক্রম করার পরও যদি এমন ভুল থেকে যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের পেশাগত দক্ষতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

পড়ুন:  ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু, ১৮ লাখের বেশি পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ

বর্তমান ব্যবস্থায় প্রতিটি বিষয়ের জন্য একাধিক প্রশ্নপ্রণেতা ও মডারেটর কাজ করেন। চার সেট প্রশ্ন প্রস্তুত হওয়ার পর তা যাচাই-বাছাই, সংশোধন এবং প্রয়োজনে নতুন প্রশ্ন তৈরিরও সুযোগ থাকে। এরপর লটারির মাধ্যমে পরীক্ষার দিন ব্যবহৃত প্রশ্নপত্র নির্বাচন করা হয়। এত দীর্ঘ ও বহুস্তরীয় প্রক্রিয়া থাকার পরও প্রশ্নে ভুল থেকে যাওয়াকে শিক্ষা বিশ্লেষকেরা প্রশাসনিক ব্যর্থতা বলেই মনে করছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমানের মতে, সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়ন ও মডারেশনের ক্ষেত্রে আরও দক্ষতা, প্রশিক্ষণ এবং সতর্কতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশ্ন প্রণয়নকারীদের সক্ষমতা নিয়মিত মূল্যায়ন এবং জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, ভুল প্রশ্নের জন্য পূর্ণ নম্বর দেওয়া তাৎক্ষণিক সমাধান হতে পারে, কিন্তু এটি মূল সমস্যার সমাধান নয়। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে প্রশ্ন প্রণয়ন ও মডারেশন প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। একই সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলার ক্ষেত্রে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রে ভুল শুধু একটি প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থার ওপরও আঘাত হানে। তাই এ ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর সংস্কার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।