সাবেক স্পিকার ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা নেতা ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার আর নেই

ঢাকা, ১২ জুলাই: সাবেক জাতীয় সংসদ স্পিকার, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা নেতা এবং প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার আর নেই। রোববার (১২ জুলাই) ভোর ৪টা ১৯ মিনিটে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতায় তিনি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার বাংলাদেশের আইন, রাজনীতি ও সংসদীয় গণতন্ত্রের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেন।
১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর তৎকালীন জলপাইগুড়ি জেলার (বর্তমান পঞ্চগড় জেলার) তেতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে তার জন্ম। তার বাবা ছিলেন মৌলভী আলী বক্স এবং মা বেগম ফখরুন্নেছা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর এলএলবি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ১৯৬১ সালে যুক্তরাজ্যের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল ডিগ্রি লাভ করেন এবং দেশে ফিরে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন বিষয়ে দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি প্রথমে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার পর তিনি দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও দীর্ঘদিন স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ভূমি, শিক্ষা, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সংসদীয় রীতি-নীতি অনুসরণ, নিরপেক্ষতা এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেন।
আইন ও আন্তর্জাতিক বিষয়েও তার ছিল বিশেষ আগ্রহ। আন্তর্জাতিক আইন, সমুদ্র আইন, জাতিসংঘ এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। পাশাপাশি নিজ জন্মভূমি পঞ্চগড়ে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার কলেজিয়েট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বেগম নুর আখতারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের এক মেয়ে ও দুই ছেলে রয়েছেন। দুই ছেলেই ব্যারিস্টার হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত।
ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে দেশের আইন অঙ্গন, রাজনীতি এবং সংসদীয় গণতন্ত্রে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ কর্মজীবনে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ, আইনের শাসন এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চায় তার অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।
