দুবাইয়ে গ্রেপ্তার সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ

নিজস্ব প্রতিবেদক
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আজ রোববার বাংলাদেশ পুলিশের সদর দপ্তরের মুখপাত্র এআইজি শাহাদাত হোসেন গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পুলিশ সূত্র জানায়, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আলোকে তাঁকে আটক করা হয়েছে। এ বিষয়ে গত ১২ জুন বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়।
তবে কোন নির্দিষ্ট মামলার ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কী হবে কিংবা তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকার কোনো উদ্যোগ নিয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের সাত বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যার মধ্যে বেনজীর আহমেদও ছিলেন।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এলে তদন্ত শুরু করে দুদক। অভিযোগ ওঠার পরপরই তিনি দেশ ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয় এবং আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি আদালত ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন। এর আগে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে বেনজীর আহমেদ, তাঁর স্ত্রী জীশান মীর্জা এবং দুই মেয়ের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা করে দুদক।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ২ কোটি ৬২ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়। তাঁর স্ত্রী জীশান মীর্জার বিরুদ্ধে ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ১৬ কোটি ১ লাখ টাকার সম্পদ গোপনের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তাঁদের বড় মেয়ে ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং মেজ মেয়ে তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১২ জুন আদালত বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের নামে থাকা ৮টি ফ্ল্যাট এবং প্রায় ২৫ একর ২৭ কাঠা জমি ক্রোক করার আদেশ দেন। এসব সম্পদের মধ্যে ঢাকার বাড্ডা ও আদাবরের ফ্ল্যাট এবং নারায়ণগঞ্জ, বান্দরবান ও উত্তরার জমি রয়েছে। এছাড়া গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে ৬২১ বিঘা জমি, ১৯টি কোম্পানির শেয়ার, গুলশানের ৪টি ফ্ল্যাট, ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব এবং ৩টি বিও হিসাবও আদালতের আদেশে জব্দ বা অবরুদ্ধ করা হয়।
বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় এখন তাঁর প্রত্যর্পণ (Extradition) এবং বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বিদ্যমান আইনি সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর।
