বিজন ভাবনা

বিজন ভাবনা(৪৫): শিক্ষা  

-বিজন সাহা

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শুরুতে শত্রু পক্ষে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের দেখে অর্জুন যখন যুদ্ধ করতে অনীহা প্রকাশ করে গাণ্ডীব নামিয়ে রাখেন, সারথী শ্রীকৃষ্ণ তখন তাঁকে যুদ্ধ করতে অনুপ্রাণিত করার জন্য যে বাণী শোনান সেটাই পরবর্তীতে ভাগবৎ গীতা হিসেবে পরিচিতি পায় যদিও মহাভারতে এটাকে অর্জুনের বিশ্বরূপ দর্শন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এই কথোপকথনের  এক পর্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন “যখন পৃথিবী অধর্মে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে তখন সাধুদের রক্ষা ও দুর্বৃত্তদের দমনের জন্য ঈশ্বর অবতার রূপে পৃথিবীতে আসেন।” কৃষ্ণের দীর্ঘ মোটিভেশনাল স্পীচের ধাক্কা সইতে না পেরে অর্জুন শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করতে রাজি হন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবদের জয় হয়, কৌরবরা পরাজয় বরণ করে। মহাভারতের কাহিনী অনুযায়ী পাণ্ডবরা ছিল আলোর পক্ষে, ধর্মের পক্ষে, সত্যের পক্ষে। তাই তাদের বিজয় ছিল স্বাভাবিক। তাহলে অস্বাভাবিক কি? মহাভারত ও অন্যান্য হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী এই যুদ্ধের কিছু কাল পরে দ্বাপর যুগ শেষ হয়ে যায়, পৃথিবী প্রবেশ করে কলি যুগে। হিন্দু পুরাণে চার যুগের উল্লেখ আছে – সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি। সত্য যুগে সত্যের একচ্ছত্র আধিপত্য, ত্রেতায় তিন চতুর্থাংশ সত্য আর এক চতুর্থাংশ মিথ্যা, দ্বাপরে ফিফটি ফিফটি এবং কলিতে সত্য মাত্র এক চতুর্থাংশ বাকি তিন চতুর্থাংশ মিথ্যা। তাই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে সত্য জয়ী হলেও কলিতে প্রবেশ করে পৃথিবী আরোও বেশি করে মিথ্যায় নিমজ্জিত হয়েছে। এটা রূপক। কিন্তু বাস্তবে কি দেখি? সব সময়ই শান্তি, প্রগতি, গণতন্ত্র, সাম্য এসব স্লোগান দিয়ে নতুন শক্তি, নতুন ব্যবস্থার আবির্ভাব ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব অধরাই থেকে যায়, কিছু লোক এ থেকে লাভবান হলেও সাধারণ মানুষ বঞ্চিতই থেকে যায়। গণতন্ত্র আনার নামে কত ইরাক, কত লিবিয়া, কত সিরিয়া ধ্বংস স্তুপে পরিণত হয়, এমনকি সার্বিক বিচারে জনগণের অবস্থা আরও খারাপ হয়। এত দূরে যাওয়ার দরকার নেই। ২০২৪ সালে বাংলাদেশেও গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল বৈষম্য বিরোধী স্লোগান সামনে এনে। আমার সোনার বাংলা, বাংলার মাটি বাংলার জল, ধনে ধান্যে পুষ্পে ভরা ইত্যাদি সব দেশাত্মবোধক গান গেয়ে ছাত্র জনতা স্বৈরাচারকে উৎখাত করে শেষে নিজেরাই আরও বড় স্বৈরাচারকে ক্ষমতায় বসাল। স্বাধীন দেশ বিক্রি হল ক্লাইভের উত্তরসূরিদের কাছে। বৈষম্য বহু গুণে বেড়ে গেল। ন্যায় বিচার পালিয়ে গেল দেশ থেকে। এক কথায় মানুষ আবার জিম্মি হল আরও ভয়ঙ্কর স্বৈরাচারের কাছে। আশা ছিল নির্বাচনের পরে যখন নতুন সরকার গঠিত হবে তখন মবতন্ত্রের অবসান ঘটবে। কিন্তু বাস্তবতা সেটা বলে না। তাই যেকোনো পরিবর্তনের প্রতিই সন্দেহ জাগে আবার কী বিপদ আসে ছদ্মবেশে। পদার্থবিদ্যায় এনট্রপি বলে একটা ধারণা আছে, যাকে বলা যায় বিশৃঙ্খলার মাত্রা যা সময়ের সাথে বেড়েই চলে। বর্তমানে রাজনীতিও অনেকটা সেই রূপ নিয়েছে, নেতারা যত স্বপ্নই দেখাক না কেন, কিছু কিছু ব্যতিক্রম ব্যতিরেক সব ক্ষেত্রেই জনগণের জীবনে বিপর্যয় বেড়েই চলেছে।

ইত্তেফাকের খবর দেশে তিনটি করে ভাষা শেখানো বাধ্যতামূলক। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই ব্যবস্থা আছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে তা ছিল, রাশিয়ায়ও সেটা বিদ্যমান। এখানে সাধারণত ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, জার্মান, স্প্যানিশ, আরবি এসব জনপ্রিয়। ইদানিং যোগ হয়েছে চীনা ও কোরিয়ান। তবে আমাদের দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে মনে হয় এটা যতটা না ভাষার প্রতি ভালোবাসা থেকে তারচেয়ে বেশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে। আমার ধারণা এটা বাংলাদেশকে ইসলামী রাষ্ট্র করার চুড়ান্ত ধাপ। উর্দু চালু করার প্রচেষ্টা। বাংলা, ইংরেজি আছে। তৃতীয় ভাষাটা কী? প্রশ্ন উঠতে পারে যে “তৃতীয় ভাষা” কোনটি হবে তা কী সরকার নিশ্চিত করেছে?  সরকার সেটা নিশ্চিত করতে পারে না, ছাত্ররা বেছে নেয়। তবে বেছে নিতে পারে তখনই যখন বেছে নেয়ার মত পরিবেশ থাকে। এটা অনেকটা সোভিয়েত আমলে দোকানে পণ্যের মত। মানুষের হাতে টাকা ছিল, দোকানে পণ্য ছিল, কিন্তু মনোমত কেনার তেমন কিছু ছিল না। তবে তখন কেউ কিনতে বাধ্য ছিল না, এখন ভাষাটা বাধ্যতামুলক করা হচ্ছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ফ্রেঞ্চ, জার্মান, স্প্যানিশ, চাইনিজ, জাপানিজ, কোরিয়ান এসব ভাষা বেছে নেবার অধিকার থাকলেও শিক্ষক পাওয়া যাবে না। যদি সরকার তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক করে তবে সেজন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে শিক্ষক সহ অন্যান্য বিষয় দেখতে হবে। “যতদূর জানি বাংলাদেশে মাধ্যমিক স্কুল আছে প্রায় ২০/২২ হাজার। কলেজ আছে প্রায় ৪৫০০ টি। এমনকি আরবি ও উর্দু ভাষা শেখানোর জন্য এত শিক্ষক বাংলাদেশে নেই। এত বছর ইংরেজি চালু থাকার পরেও স্কুল/কলেজে ইংরেজি ভাষায় শিক্ষকের সংকট চলছে। প্রকৃতপক্ষে সকল শিক্ষার্থীকে তৃতীয় ভাষা শেখানোর জন্য অবকাঠামোগত প্রস্তুতি বাংলাদেশের নেই।” উপরের এই কথাগুলো শিক্ষা নিয়ে আমার এক স্ট্যাটাসে এক বন্ধুর আলোচনা থেকে ধার করা। যেহেতু সে দীর্ঘ দিন ধরে শিক্ষা ব্যাবস্থার সাথে জড়িত তাই এই কথাগুলো যৌক্তিক বলেই মনে করি। সমস্যা হল তৃতীয় ভাষা শেখা ও শেখানো ছাত্র ও স্কুলের জন্য বাধ্যতামূলক হলেও সরকার বাধ্য নয় পরিবেশ সৃষ্টি করতে। তবে স্কুলে ধর্ম ক্লাসে এমনিতেই আরবি পড়ানো হয়। শিক্ষক তো আছেই। এই পরিস্থিতি আরবিকে তৃতীয় ভাষা করতে আগ্রহী করবে। দেশের একদল মানুষ যারা এখনো পাকিস্তানের আদর্শিক ও রাজনৈতিক বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি তারা চাইবে উর্দু। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার জিন্নাহর অভিপ্রায় থেকেই ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ। ওরা যেহেতু মুক্তিযুদ্ধকেই অস্বীকার করে তাহলে উর্দু হবে ওদের প্রথম পছন্দ। কোনভাবে একবার চালু করতে পারলে একদিন রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে সমস্যা হবে না। এখানে সুবিধা হল ভারতীয় টিভি চ্যানেলের কল্যাণে অনেকেই হিন্দি জানে, উর্দু থেকে হিন্দির মূল পার্থক্য লেখায়, আরবি জানা থাকায় সেটাও সমস্যা হবে না। তাই এই তৃতীয় ভাষা শুধু একটি ভাষা নয়, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপরেখা। তৃতীয় ভাষার ধারণা প্রগতিমুখী পদক্ষেপ হলেও আমাদের দেশের বাস্তবতায় সেটা আমাদের উল্টো পথে হাঁটাতে পারে।

পড়ুন:  বিজন ভাবনা (৪৪): রাজনীতির কানাগলি  - বিজন সাহা

অতএব আমরা কী দেখছি? এই যে তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে – এটা কার জন্য বাধ্যতামূলক? সরকার, স্কুল কর্তৃপক্ষ, ছাত্র এই শেকলের সবচেয়ে দুর্বল লিঙ্ক ছাত্র। ছাত্র বাধ্য হবে তৃতীয় ভাষা হিসেবে কিছু একটা বেছে নিতে। কিন্তু বাছতে হবে সেই ভাষা যা স্কুলে আছে। এরপর আসে স্কুল। স্কুল বাধ্য হবে বাংলা ইংরেজির বাইরে আরেকটি ভাষার শিক্ষক নিয়োগ দিতে। এটা কোথায় পাবে? পন্ডিত বা মৌলভী? তাঁরা ধর্ম ক্লাসে সংস্কৃত বা আরবি পড়ালেও সেটা অক্ষর জ্ঞান, ভাষা শিক্ষা ঠিক নয়। তাহলে? আরবি ভাষায় কথা বলা ওয়াজি হুজুরদের ডাকা? কিন্তু এই যে সরকার তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক করে ডিক্রি জারি করল প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও শিক্ষক সরবরাহ করতে সে কি বাধ্য? সেই জবাবদিহিতা কি আমাদের দেশে আছে?

বর্তমানে কোন কিছু মেরামত করার চেয়ে নতুন করে তৈরি করাই লাভজনক। তবে দালান কোঠার ক্ষেত্রে ঠিক হলেও শিক্ষার ক্ষেত্রে সেটা ভুল। অন্তত অধিকাংশ ক্ষেত্রে। বিরোধী দল থাকা কালে সবাই সরকারের বিভিন্ন কাজের সমালোচনা করে, কিন্তু ক্ষমতায় এলে সবাই আগের মতই চলে। এটা যেন রেল লাইন, সহজে পথ বদলানো যাবে না। শেখ হাসিনার আমলে কে না শিক্ষানীতির সমালোচনা করেছে, বিশেষ করে পাঠ্যক্রম থেকে বাংলা সাহিত্যের সেরা লেখকদের লেখা বাদ দেয়ায়? সমালোচনা হয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষাকে সাধারণ স্কুল শিক্ষার সমমর্যাদা দেবার। সরকার যদি সত্যকার অর্থেই দেশের শিক্ষার ব্যাপারে সচেতন হয় তাহলে উচিৎ এসব পরিবর্তন বাতিল করে পুরানো শিক্ষানীতিতে ফিরে যাওয়া। কিন্তু সেটা কিন্তু করবে না। কারণ আমাদের দেশের অধিকাংশ সরকার মৌলবাদীদের খুশি রাখাকেই জনসেবা বলে মনে করে।

একদিকে আমরা নতুন ভাষা শিক্ষার কথা বলব, অন্যদিকে শিক্ষক আর সেই সাথে স্কুলকে অনবরত অপমান করব সেটা কি করে হয়। এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। গৌরাঙ্গ সরকার নামে এক গণিতের শিক্ষক পুলিশের হেফাজতে ইসলাম ও মহানবীকে নিয়ে কটুক্তি করার অভিযোগে। বেশ কয়েক বছর আগে হৃদয় মন্ডলকে নিয়ে এই নাটক হয়েছিল। আমি একটি বিষয় কিছুতেই বুঝতে পারি না গণিত বা বিজ্ঞানের ক্লাসে কীভাবে ধর্মের আলোচনা আসে যদি না ছাত্রদের কেউ ইচ্ছাকৃত ভাবে এ ব্যাপারে উস্কানি দেয়। শিক্ষকদের নাম ধাম দেখে প্রথমেই যেটা মনে হয় তা হল একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করতে এসব ব্যবস্থা। এটা ঠিক সংখ্যালঘুদের ভয় দেখানো অনেক সহজ। এজন্য এমনকি আইনের আওতায়ও আসতে হয় না। কিন্তু এটাই কি মূল কারণ নাকি মূল কারণ গভীরে। সাধারণ ভাবে আধুনিক শিক্ষা আর বিশেষ করে গণিত, বিজ্ঞান মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায় আর এটাই বর্তমান বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষের সাথে যায় না। তাই হিন্দু শিক্ষকদের নাজেহাল করা মূলত আধুনিক শিক্ষা প্রত্যাখ্যান করার প্রথম পদক্ষেপ। মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিক শিক্ষার সমান মর্যাদা দিয়ে সেই যাত্রা শুরু হয়েছিল। বাকি রইল মাদ্রাসা শিক্ষাকেই একমাত্র শিক্ষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। এজন্য গৌরাঙ্গ সরকার নাটক মঞ্চস্থ করা হয়। যদি খেয়াল করি দেখব দেশের মানুষের একটি সংগঠিত অংশ বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছে। এমনকি আওয়ামী সরকারের আমল থেকেই তারা তাদের পরিকল্পনা সফল করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। গান বাজনা, নাটক, যাত্রা, মেলা এসব বিলুপ্ত প্রায়। এখন থেকে সচেতন না হলে আধুনিক শিক্ষা এই পথেই যাবে। তাই গৌরাঙ্গ সরকারের বিষয়টি শুধু ধর্মীয় কোণ থেকে না দেখে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কি হতে যাচ্ছে সেদিকে থেকে দেখা দরকার আর এজন্যেই ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে যারা আধুনিক শিক্ষার পক্ষে তাদের উচিৎ গৌরাঙ্গ সরকারের পাশে দাঁড়ানো। কারণ এর মধ্য দিয়ে আপনি গৌরাঙ্গ সরকার নয়, আপনার সন্তানদের আলোকিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করছেন। এটা শুধু আমাদের মত সাধারণ মানুষের দায়িত্ব নয়, সরকারেরও দায়িত্ব। কারণ ছাত্রদের হাতে নাজেহাল হবার ভয় নিয়ে সঠিক শিক্ষা দান করা কঠিন। সরকার যদি সত্যিকার অর্থেই শিক্ষার ব্যাপারে সচেতন হয় তবে ভাষার আগে তাকে স্কুলে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে, শিক্ষকদের মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে হবে। আমরা যতই স্বৈরাচার মুক্ত দেশ গড়তে চাই না কেন, যদি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ গড়ে তুলতে না পারি হাজার গণঅভ্যুত্থান করেও সত্যিকারের গণতান্ত্রিক দেশ গড়া সম্ভব হবে না।

গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো