চমেকে হামের থাবা: অক্সিজেন পাইপের অপেক্ষায় ৯ মাসের সুরাইয়ার মৃত্যু, ১৪ ঘণ্টায় প্রাণ গেল ৪ শিশুর
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু আইসিইউর সামনে তখন জীবন বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা। হাতে একটি স্লিপ, তাতে লেখা হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলার নাম। মেয়ের শ্বাসপ্রশ্বাস চালু রাখতে প্রয়োজন ছিল বিশেষ অক্সিজেন পাইপের। সেটি জোগাড় করতে গত কয়েক ঘণ্টা ধরে ছোটাছুটি করছিলেন কক্সবাজারের আলোকচিত্রী মোহাম্মদ আলম। অবশেষে একটি কোম্পানিতে পাওয়া যায় সেটি। বলা হয়েছিল, আধা ঘণ্টার মধ্যেই হাসপাতালে পৌঁছে যাবে।
কিন্তু সেই আধা ঘণ্টাও পায়নি ৯ মাস বয়সী সুরাইয়া আলম।
আজ সোমবার বেলা পৌনে দুইটার দিকে শিশু আইসিইউর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মোহাম্মদ আলমের মুঠোফোনে কল আসে। ফোনের ওপাশ থেকে এক নার্স জানিয়ে দেন, তাঁর মেয়ে আর বেঁচে নেই। খবর শুনেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। হাতে তখনও ধরা ছিল অক্সিজেন পাইপের স্লিপটি। কয়েক মিনিট আগেই তিনি ফোনে অনুনয় করছিলেন দ্রুত পাইপটি পৌঁছে দিতে। সাড়ে ১১ হাজার টাকার সেই যন্ত্রাংশটির আর প্রয়োজন হলো না।
আইসিইউর ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে শিশুটির মা ছেনোয়ারা বেগম চিৎকার করে বলতে থাকেন, “আর কিচ্ছু লাগবে না… আমার মেয়ে নাই। আর কোনো অক্সিজেন পাইপ লাগবে না।”
হামের জটিলতায় মৃত্যু
চমেক হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সুরাইয়ার শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছিল। হামের জটিলতা থেকে তার মস্তিষ্কে প্রদাহ হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় “মিজেলস এনসেফালাইটিস”। এ ধরনের জটিলতায় উচ্চ জ্বর, খিঁচুনি, অচেতন হয়ে যাওয়া এবং স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সৈকতে পর্যটকদের ছবি তুলে জীবিকা নির্বাহ করতেন মোহাম্মদ আলম। মেয়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে নিজের একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম ক্যামেরাটিও বিক্রি করে দেন তিনি। তবুও শেষ পর্যন্ত মেয়েকে বাঁচাতে পারলেন না।
বিকেল তিনটার দিকে ছোট্ট সুরাইয়ার মরদেহ নিয়ে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দেন স্বজনেরা। নিথর সন্তানের দেহ জড়িয়ে ধরে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন মা ছেনোয়ারা বেগম। পেছনে হাঁটতে হাঁটতে মোহাম্মদ আলম বিড়বিড় করে বলছিলেন, “আদরের ধন বেশি দিন থাকে না ভাই।”
সংকটে হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সুরাইয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল “ফিশার অ্যান্ড পায়াকেল এয়ারভো-২ এইচএফএনসি সার্কিট” নামের একটি বিশেষ যন্ত্রাংশ, যা উচ্চ প্রবাহে উষ্ণ ও আর্দ্র অক্সিজেন সরবরাহ করে শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। নিউমোনিয়া, তীব্র শ্বাসকষ্টসহ জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, শিশু আইসিইউর ২০টি শয্যার মধ্যে ১৫টিতেই হাম ও উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত শিশু ভর্তি রয়েছে। আইসিইউতে থাকা ১২টি হাই ফ্লো মেশিনের অন্তত দুটি নষ্ট বা ফুটো অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের এক চিকিৎসক জানান, শিশু আইসিইউটি মূলত অনুদানে পরিচালিত। অধিকাংশ যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে চিকিৎসক কিংবা রোগীর পরিবারকেই অর্থ জোগাড় করে কিনতে হয়। সুরাইয়ার ক্ষেত্রেও প্রথমে একটি হাই ফ্লো মেশিন ব্যবহার করা হলেও সেটি ফুটো ছিল। পরে আরেকটিতেও সমস্যা দেখা দেয়। বাধ্য হয়ে রোগীর স্বজনদের যন্ত্রাংশ কিনতে বলা হয়।
মেয়ের মৃত্যুর পর কান্নাজড়িত কণ্ঠে মোহাম্মদ আলম প্রশ্ন তোলেন,
“আইসিইউ থেকে একটা বাচ্চাও কেন সুস্থ হয়ে ফিরতে পারে না? এই পাইপ ছিল না কেন? এগুলো তো আইসিইউতে থাকার কথা। আধা ঘণ্টার মধ্যে আমার বাচ্চাটা মারা গেল।”
১৪ ঘণ্টায় মৃত্যু চার শিশুর
চমেক হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, গতকাল রোববার রাত ১২টা থেকে আজ সোমবার বেলা দুইটা পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গজনিত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ছিল সুরাইয়া আলমও। বর্তমানে শিশু আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছে আরও ১৪ শিশু।
এর আগে শনিবার রাত থেকে রোববার দুপুর পর্যন্ত একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়।
তবে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যের সঙ্গে হাসপাতালের তথ্যের অসামঞ্জস্য দেখা গেছে। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দাবি, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন ভর্তি হয়েছে ৪৩ জন এবং এ সময়ে কোনো মৃত্যুর তথ্য

