চলমান সংবাদ

বিজন ভাবনা (৪১): ভুলে যাওয়া যুদ্ধ  

– বিজন সাহা

মেগা শোয়ের আলোর ঝলকানিতে যেমন ছোট শো ম্লান হয়ে যায় ঠিক তেমনি উপসাগরীয় যুদ্ধের অস্ত্রের ঝনঝনানিতে ইউক্রেন যুদ্ধ চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু তাই বলে যুদ্ধ শেষ হয়নি, শেষ হবার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ইউরোপ যেভাবেই হোক যুদ্ধ চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে আগামী নভেম্বরেই কংগ্রেস ও সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা ফিরে আসবে, যদি তখন না হয় তবে তিন বছর পর ট্রাম্প বিদায় নেবেন। তাই এখন তাদের লক্ষ্য যুদ্ধের আগুন জিইয়ে রাখা আর কয়েক বছর পরে একযোগে রাশিয়া আক্রমণ করা। এটা আর তারা লুকিয়ে রাখে না, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নেতারা এটা এখন প্রকাশ্যেই বলে। যেহেতু বর্তমান যুদ্ধের মূল অস্ত্র ড্রোন তাই তারা নিজ নিজ দেশে ড্রোন তৈরির কারখানা স্থাপন করছে। ঘোষণা দিয়েছে আগামী এক বছরে ইউক্রেনকে ১২০ হাজার ড্রোন সরবরাহ করার কথা। প্রায় প্রতিদিনই রাশিয়ার বিভিন্ন শহরের বেসামরিক স্থাপনা, বাড়িঘর ইউক্রেনের ড্রোন আক্রমণের শিকার হচ্ছে। আর এসব অস্ত্র সরবরাহ করছে ইউরোপ। মুখে যতই মানবতার কথা বলুক ওদের কাছে ভালো রুশ হল মৃত রুশ। তাই ইউরোপ সর্বতোভাবে চেষ্টা করবে ইউক্রেনের হাত দিয়ে যত বেশি সম্ভব রুশ হত্যা করতে, এদেশের অর্থনীতি ধ্বংস করতে, মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা, সরকারের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করতে। এটা তাদের রণকৌশল। যুদ্ধ চলছে চার বছরের উপরে। প্রথম দিকে বা কুরস্ক আক্রমণের পরে মানুষের মধ্যে যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল সেটা ধীরে ধীরে শিথিল হচ্ছে। শিথিল হচ্ছে যুদ্ধের ক্লান্তিতে। অনেকদিন পর্যন্ত আমরা যুদ্ধের আগুন খুব একটা টের পাইনি। তবে এখন মাঝে মধ্যেই দুবনায় ড্রোন আক্রমণ হয়। কারণ এখানে ড্রোন তৈরি হয়। হঠাৎ রাতের বুক চিরে যখন ড্রোন ধ্বংসকারী মিসাইলের তীব্র আওয়াজ শুনি তখন কিছুটা হলেও বুক কেঁপে ওঠে। এটা আমার একার নয়। মনে হয় সবার মধ্যে না হলেও অনেকের মধ্যেই এই ভয়, এই ভাবনা কাজ করে। আর পশ্চিমা বিশ্ব এটাই চাইছে।

কয়েক দিন আগে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বাল্টিকের দেশগুলো, জার্মানি, ইংল্যান্ড, স্পেন, ইতালি সহ বিভিন্ন দেশে ড্রোন তৈরির কারখানার নাম ঠিকানা প্রকাশ করেছে। যেহেতু এসব কারখানা ইউক্রেনের সাথে যৌথ মালিকানায় করা হয়েছে তাই এখানে তৈরি ড্রোন ইউক্রেনেই আসবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য। ইউরোপের দেশগুলোর যৌথ কারখানা করার ও সেটা ঘোষণা দেবার মূল উদ্দেশ্য মনে হয় একদিকে ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ করা, অন্যদিকে এই অস্ত্র দিয়ে যদি রাশিয়ার উপর আক্রমণ করা হয় সেই দায়দায়িত্ব ইউরোপ এড়ানোর চেষ্টা করতে পারবে। তাই রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছে যে এসব কারখানা আক্রমণের আইনগত অধিকার রাশিয়ার আছে। রুশরা বলে এ বলবে বি বলতে হয়। যদি এই ঘোষণার পরে রাশিয়া চেয়ে চেয়ে দেখে এসব দেশে উৎপন্ন ড্রোন বিভিন্ন রুশ শহরে আঘাত হানছে আর রাশিয়া ইউক্রেনের উপর আক্রমণ চালিয়ে গেলেও ঐসব দেশ আক্রমণ করছে না সেটা তাদের চোখে রাশিয়াকে কাগুজে বাঘে পরিণত করবে। সেটা তাদের আর বেশি উদ্ধত করবে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে উৎসাহিত করবে। অন্যদিকে এসব দেশ আক্রমণ করলে সেটা পারমাণবিক যুদ্ধের রূপ নিতে পারে। এখানে ইউক্রেন যুদ্ধের ঠিক আগের মুহূর্তের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। সেই সময় ইউক্রেন দনবাস আক্রমণ করার জন্য শুধু যে প্রস্তুত হচ্ছিল তাই নয়, বিভিন্ন ভাবে ইউরোপ রাশিয়াকে ইউক্রেন আক্রমণে উস্কানি দিচ্ছিল। উদ্দেশ্য একটাই – রাশিয়া আগে ইউক্রেন আক্রমণ করবে, এরপর রাশিয়ার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সহ অন্যান্য ব্যবস্থা যৌক্তিক করে তুলবে। ঠিক এই পথেই এখন ইউরোপ চলছে। চাইছে রাশিয়া যেন কোন কারখানা আক্রমণ করে আর সেই আক্রমণের লেজ ধরে সমস্ত ইউরোপ রাশিয়া আক্রমণ করার ম্যান্ডেট পায়। তাই ইউরোপ সর্বতোভাবে চেষ্টা করবে রাশিয়াকে নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামাতে। ইউক্রেনের মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রি এখন ইউরোপের অর্থে ইউরোপে শুধু অস্ত্র তৈরিই  করছে না, শোনা যায় ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে ব্রিটেনের এক সেনানায়ক। যদি সেটা সত্য হয় তাহলে তা শুধু একজন সেনাপতি নয়, ব্রিটেনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক – সমস্ত প্রশাসনই এর সাথে জড়িত। ইউরোপ ইউক্রেনকে আর ৯০ বিলিয়ন ডলার ক্রেডিট বরাদ্দ করেছে। যদি তাদের এই বিশ্বাস না থাকত যে রাশিয়াকে পরাজিত করে ইউক্রেন সেই অর্থ ফেরৎ দেবে তাহলে কি তারা এই রিস্ক নিত? কেন নিচ্ছে? উদ্দেশ্য একটাই সবাই মিলে রাশিয়ার সম্পদ ভাগাভাগি করে নেওয়া। পারবে কি?

আসলে এখন পর্যন্ত কেউ বাইরে থেকে রাশিয়া জয় করতে পারেনি। শুধু মাত্র ভেতরে পঞ্চম বাহিনী তৈরি করতে পারলেই তারা সাময়িক ভাবে সফল হয়েছে। সেই চেষ্টা সোভিয়েত আমল থেকেই চলে আসছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে যে নতুন সরকার গঠিত হয় সেখানে যে শুধু আমেরিকার ডিপ স্টেটের লোকজন  উপদেষ্টা হিসেবে যে ছিল তাই নয়, অনেক রুশ নাগরিক, কমিউনিস্ট পার্টির অনেক উচ্চপদস্থ লোকজনও এর সাথে জড়িত ছিল। আর এদের হাতেই সোভিয়েত ব্যবস্থা, কলকারখানা সব ধ্বংস হয়েছিল। এখনও মনে পড়ে চুবাইসের উক্তি যার সারমর্ম – আমাদের একটাই উদ্দেশ্য ছিল, দেশের সবকিছু এমন ভাবে ভেঙ্গে ফেলা যেন সে আর কোন দিন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। প্রাইভেটাইজেশন থেকে শুরু করে সবই ছিল সেই পরিকল্পনার অংশ। চলমান কলকারখানা লাভজনক করার চেষ্টা করা হয়নি, জলের দামে বিক্রি করে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। শুধুমাত্র খনিজ পদার্থের পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করেছে নব্য মালিকরা, দেশের সম্পদ বিদেশে বিক্রি করে বিশাল অর্থের মালিক হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে যারা দেশকে শোষণ করে পশ্চিমা বিশ্বে সম্পদ পাচার করেছে এবং যারা রাশিয়াকে যেকোনো মূল্যে পশ্চিমা বিশ্বের আজ্ঞাবাহী ভৃত্য হিসেবে দেখতে চায় এবং যারা এক সময় সোরস ফান্ড থেকে সাহায্য পেয়েছে তাদের একটা বড় অংশ এখনও ভেতর থেকে দেশকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে তাদের নাশকতামূলক তৎপরতা তত বাড়ছে। এছাড়া ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে পশ্চিমা বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা বিশেষ করে এমআই-৬ এদেশের সাধারণ নাগরিকদের উপর সাইকোলজিক্যাল প্রভাব খাটিয়ে তাদের দিয়ে নাশকতামূলক কাজ করানোর কাজে লিপ্ত আছে। এর শিকার মূলত বয়স্ক নাগরিকরা ও টিন এজাররা। প্রায়ই স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থার লোক বলে টেলিফোনে নিজেদের পরিচয় দিয়ে দেশের স্বার্থে কোন কিছু করার জন্য আহ্বান জানান হয়। বলা হয় কোন লোক দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, তাই তার উপর আক্রমণ চালাতে হবে। এসব মানুষ সেটা বিশ্বাস করে হয় কোথাও আগুন লাগায় অথবা দেশের কাজে অর্থ দান করছে ভেবে ইউক্রেনের সেনাদের জন্য অর্থ সাহায্য করে। প্রায় প্রতিদিনই সমস্ত জায়গা থেকে এ নিয়ে বলা হলেও কেউ না কেউ ফাঁদে পা দিচ্ছে। এখন তো অনেকে না জেনেই আত্মঘাতী হচ্ছে। এদের বলা হয় অর্থের বিনিময়ে কোন পার্সেল কোথাও পৌঁছে দেবার জন্য এবং ঠিকানায় পৌঁছে ফোন করার জন্য। যে মুহূর্তে ফোন করে সেই মুহূর্তে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে বোমা বিস্ফোরণ করা হয়। এক কথায় ইউক্রেন এখন অল আউট সন্ত্রাসী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে আর ইউরোপ সর্বাত্মক ভাবে তাতে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। ইউরোপ পরিণত হয়েছে সরবরাহ কেন্দ্রে। মনে রাখতে হবে যুদ্ধের সময় যদি কোন পক্ষ তার সরবরাহ কেন্দ্র প্রতিপক্ষের আক্রমণের বাইরে রাখতে পারে সেই যুদ্ধে জয়ী হওয়া কঠিন। তাই যুদ্ধে জয়ী হতে হলে ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় রাশিয়াকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহকারী কলকারখানার দিকে নজর দিতে হবে। সেটা যত তাড়াতাড়ি দেবে ততই মঙ্গল।

পড়ুন:  বিজন ভাবনা (৪০): আওয়ামী লীগ    -বিজন সাহা

সব দেখে মনে হয় রাশিয়ার মানুষ ইউরোপের উপর ধীরে ধীরে বিরক্ত হচ্ছে এবং যদি রুশ সরকার ইউরোপ আক্রমণ করে তাহলে সেটা সমর্থন করবে। কেন পুতিন সেটা করছেন না এটাই এখন অনেকের কাছে বোধগম্য নয়। তবে এরা বোঝে এ জন্য ইউরোপের মানুষ দায়ী নয়, দায়ী ইউরোপের এলিট শ্রেণী। আবার অনেকের ধারণা পুতিন আসলে সময়ের অপেক্ষা করছেন। হ্যাঁ, সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আজ খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কাল খুব দেরি হয়ে যাবে – এপ্রিল থিসিসে লেনিনের সেই বিখ্যাত উক্তি। কী লোকবল, কী অর্থনীতি, কী টেকনোলজি – সব ক্ষেত্রেই ইউরোপ রাশিয়ার থেকে শক্তিশালী। তবে সামরিক ভাবে এখনও দুর্বল। বিগত চার বছর যুদ্ধে রাশিয়া নতুন করে সেনাবাহিনীকে গড়ে তুলেছে।  আফগান যুদ্ধ ও  চেচনিয়ার যুদ্ধের পরে রুশ সেনাবাহিনীর মনোবল তলানিতে ছিল মূলত রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে। তবে সেসব দিন এখন সুদূর অতীত।  ইউরোপের এলিট ধরেই নিয়েছে যে রাশিয়া তাদের আক্রমণ করলেও সর্বশক্তি দিয়ে করবে না। পশ্চিমা বিশ্ব যেখানে বাছবিচার না করে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষের উপর আক্রমণ করে, হত্যা করে, রাশিয়া সেক্ষেত্রে এ ধরণের কিছু করে না। সেটা পশ্চিমা বিশ্ব এদের দুর্বলতা বলে মনে করে। সব দেখে মনে হয় পশ্চিমা এলিট শ্রেণী এখন কালেক্টিভ সুইসাউডের দিকে অদম্য গতিতে এগিয়ে চলছে। যখন অর্থনীতি ধ্বংসের পথে তখন তারা একের পর এক রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করে মূলত নিজদের অর্থনীতি ও জনগণের অপরিসীম ক্ষতি করছে। সেটা যে যুদ্ধ ক্ষেত্রে করবে না কে জানে। তারাও হয়ে উঠবে একেক জন জিলেনস্কি যে পরাজয় নিশ্চিত জেনেও একের পর এক দেশের মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। কেন? কারণ তাদের আত্মীয়-স্বজন, ধন-সম্পদ পশ্চিমা বিশ্বে। যুদ্ধ তাদের জন্য ব্যবসা – প্রচণ্ড লাভজনক ব্যবসা। পশ্চিমা এলিটরাও তাই। আসলে এরা পশ্চিমা এলিট নয়। তারা বিশ্ব নাগরিক – যাদের একটাই উদ্দেশ্য যেকোনো মূল্যে নিজেদের খায়েশ মেটানো। যখন কেউ আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি হারিয়ে ফেলে তখন তাকে বাঁচানো কঠিন।

সাধারণত ভ্লাদিমির পুতিন ও সেরগেই লাভরভ পশ্চিমা বিশ্বের নেতাদের প্রতি কড়া ভাষা ব্যবহার করেন না। তবে ইদানিং কালে সেটা করছেন। সব দেখে মনে হয় এরাও ঘটনার যেকোনো ধরণের ডেভেলপমেন্টের জন্য প্রস্তুত। অবশ্য কয়েক মাস আগেই পুতিন বলেছিলেন যে ইউরোপ যদি রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ করতে চায় তবে রাশিয়া প্রস্তুত।

গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো