চলমান সংবাদ

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান–এ অভিযানে মারধর বিতর্ক: অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সাম্প্রতিক মাদকবিরোধী অভিযানে মারধর, আটক ও অপমানের অভিযোগ ঘিরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ধানমন্ডি লেক এবং চাঁদপুর-এ অভিযানের ঘটনায় সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনা।

সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী মারধরের অভিযোগ

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় দুইজন সাংবাদিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর এক শিক্ষার্থী ও কয়েকজন পথচারীকে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশের সঙ্গে কয়েকজনের বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে লাঠিচার্জ করা হয় এবং দু’জনকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে পুলিশ জানায়, তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

আহতদের একজন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম উদ্দিন দাবি করেন, কোনো অবৈধ কিছু না পেয়েও তর্কের অভিযোগ তুলে তাদের মারধর করা হয়। অন্যদিকে, একটি বেসরকারি গণমাধ্যমের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার তোফায়েল আহমেদ অভিযোগ করেন, সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি হামলার শিকার হয়েছেন।

পুলিশের বক্তব্য: ‘ভুল বোঝাবুঝি’

ঘটনাস্থলে উপস্থিত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম বলেন, অভিযানের সময় এক মাদকাসক্তের হামলায় একজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কয়েকজনের ওপর মারধরের ঘটনা ঘটে, যা ‘ভুল বোঝাবুঝি’ থেকে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ ঘটনায় জড়িত চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়।

পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো পর্যালোচনা করে আইনের ব্যত্যয় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যান্য এলাকাতেও অভিযান

গত রোববার ও সোমবার ধানমন্ডি লেক এবং চাঁদপুর শহরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন তরুণ ও কিশোরকে আটক করে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে মাদকসেবন ও কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে আটককৃতদের মারধর, কানে ধরে উঠবস করানো বা মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

পড়ুন:  ডিবি হেফাজতে সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, আটকের কারণ এখনো অজানা

পুলিশ বলছে, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই এসব অভিযান পরিচালিত হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

আইন ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফৌজদারি কার্যবিধি (সিআরপিসি), দণ্ডবিধি, পুলিশ রেগুলেশনস বেঙ্গল (পিআরবি) এবং সংবিধান—এসব আইন পুলিশের ক্ষমতা ও দায়িত্ব নির্ধারণ করে। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বলেন, বলপ্রয়োগ হতে হবে প্রয়োজনীয়, সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সীমিত।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, বিশেষ করে জাতিসংঘের ‘বেসিক প্রিনসিপলস অন দ্য ইউজ অব ফোর্স অ্যান্ড ফায়ারআর্মস’, শক্তি প্রয়োগ কেবল তখনই করা যাবে যখন তা ‘অ্যাবসোলিউটলি নেসেসারি’ বা একান্ত প্রয়োজনীয়।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক মনে করেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের নিয়মিত অভিযান প্রয়োজন হলেও তা মারমুখি আচরণে রূপ নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া বা অসৌজন্যমূলক আচরণও অনুচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিতর্কের কেন্দ্রে জনবান্ধব পুলিশিং

জনবান্ধব পুলিশিংয়ের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে কিছু ঘটনার কারণে বাহিনীটি বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে বলে মত বিশ্লেষকদের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে অভিযান অব্যাহত থাকলেও তা আইনের ভেতরে থেকে এবং মানবাধিকার সংরক্ষণ করে পরিচালনার ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও সামনে এসেছে—আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে শক্তির সীমা কোথায় এবং সেই সীমা লঙ্ঘিত হচ্ছে কিনা—এই প্রশ্ন।