যে গল্পগুলো লেখা হয়নি–২৪: ফজলুল কবির মিন্টু

আটকে থাকা অর্জিত ছুটির টাকা আদায়: ছয়শ শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা ফিরে পাওয়ার গল্প

ঘটনাকাল: ১২ ডিসেম্বর ২০১৮

চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে অলংকার শপিং কমপ্লেক্সের তৃতীয় তলায় অবস্থিত রিজী নীট ডিজাইনস লিমিটেড। প্রায় আট বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই কারখানাটিতে কর্মরত ছিলেন প্রায় ছয়শ শ্রমিক ও কর্মচারী। প্রতিদিনের শ্রমে তাঁরা সচল রাখতেন উৎপাদন কার্যক্রম। কিন্তু নিজেদের আইনগত অধিকার অর্জিত ছুটি ভোগ করা কিংবা ছুটির বিপরীতে প্রাপ্য টাকা নগদায়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন তাঁরা।

শ্রমিকের জীবনে ছুটি মানে শুধু বিশ্রাম নয়। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, অসুস্থতা সামলানো কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কিছুটা স্বস্তি পাওয়ার সুযোগও বটে। আর অর্জিত ছুটির বিপরীতে প্রাপ্য অর্থ তাঁদের শ্রমেরই একটি আইনগত পাওনা। অথচ সেই পাওনা পেতে শ্রমিকদের বারবার অপেক্ষা করতে হচ্ছিল।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১১৭ ধারায় নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী, এক বছর অবিচ্ছিন্ন চাকরি পূর্ণ হলে প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের অর্জিত ছুটির অধিকার সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫-এর ১০৭ বিধিতে অর্জিত ছুটি নগদায়নের বিধান রয়েছে। কিন্তু আইনে অধিকার থাকলেও বাস্তবে সেই অধিকার নিশ্চিত করা সব সময় সহজ হয় না। রিজী নীট ডিজাইনসের শ্রমিকদের অভিজ্ঞতাও ছিল তেমনই।

অভিযোগ থেকে ত্রিপক্ষীয় সভা

সমস্যার সমাধানে শ্রমিকেরা সংগঠিতভাবে এগিয়ে আসেন। বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের মাধ্যমে ২০১৮ সালের ৭ জুন তাঁরা চট্টগ্রামের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে অর্জিত ছুটির টাকা নগদায়নের দাবিতে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগের ডায়েরি নম্বর ছিল ১৭৬২।

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১ জুলাই কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে একটি ত্রিপক্ষীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অভিযোগকারীদের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন তপন দত্ত, ইফতেখার কামাল খান, ফজলুল কবির মিন্টু, মো. হানিফ ও সাগর। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মানবসম্পদ ও কমপ্লায়েন্স বিভাগের ব্যবস্থাপক ছোটন চৌধুরী এবং মো. হেলাল উদ্দিন।

সভায় শ্রমিকদের উত্থাপিত দাবির সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়। আলোচনার ভিত্তিতে ৩০ জুলাই ২০১৮-এর মধ্যে শ্রমিকদের অর্জিত ছুটির টাকা নগদায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা পাওনা বুঝে পাওয়ার একটি বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। শ্রমিকেরা আশায় বুক বাঁধেন—এবার হয়তো তাঁদের ন্যায্য পাওনা হাতে আসবে।

প্রতিশ্রুতি ছিল, টাকা আসেনি

কিন্তু নির্ধারিত ৩০ জুলাই পেরিয়ে গেলেও শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মালিকপক্ষের গড়িমসিতে শ্রমিকদের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হয়।

এমন পরিস্থিতিতে শুধু অভিযোগ জানিয়ে বসে থাকলে চলবে না—সমস্যাটিকে আরও জোরালোভাবে সামনে আনতে হবে। শ্রমিকদের পাওনা আদায়ের বিষয়টি পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র এবং বিলস-এলআরএসসি সেন্টার কো-অর্ডিনেশন কমিটির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এ এম নাজিম উদ্দিনের সহযোগিতায় ক্রাইসিস কমিটির সভায় উত্থাপন করা হয়।

এর ফলে শ্রমিকদের অর্জিত ছুটির টাকা পরিশোধের বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় পাওনা পরিশোধের পথ তৈরি হতে থাকে।

দুই কিস্তিতে ফিরল ছয়শ শ্রমিকের পাওনা

অবশেষে ২০১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর এবং ১২ নভেম্বর—দুই কিস্তিতে শ্রমিকদের অর্জিত ছুটির সমুদয় টাকা পরিশোধ করা হয়। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটে। যে অর্থ শ্রমিকদের আইনগতভাবে প্রাপ্য ছিল, তা আদায়ের মাধ্যমে তাঁদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

এটি কেবল কিছু টাকা পাওয়ার ঘটনা ছিল না। প্রায় ছয়শ শ্রমিকের জন্য এটি ছিল নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা, সংগঠিত উদ্যোগ এবং ধারাবাহিক দর-কষাকষির কার্যকারিতার একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা। অভিযোগ দায়ের, ত্রিপক্ষীয় সভায় অংশগ্রহণ, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য চাপ সৃষ্টি এবং ক্রাইসিস কমিটির সভায় বিষয়টি উত্থাপন—প্রতিটি ধাপই পাওনা আদায়ের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

অধিকার আদায়ে সংগঠিত উদ্যোগই শক্তি

রিজী নীট ডিজাইনসের এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শ্রমিকের অধিকার কেবল আইন বইয়ের পাতায় লেখা থাকলেই তা বাস্তবায়িত হয় না। অধিকার আদায়ে প্রয়োজন সচেতনতা, সংগঠিত উদ্যোগ, কার্যকর অভিযোগ প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দৃঢ়তা।

অর্জিত ছুটি শ্রমিকের আইনগত অধিকার। সেই ছুটি ভোগের সুযোগ কিংবা আইন অনুযায়ী প্রাপ্য অর্থ থেকে শ্রমিককে বঞ্চিত করা গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে শ্রমিকদের অভিযোগের নিষ্পত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই যথেষ্ট নয়; সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে।

২০১৮ সালের ১২ নভেম্বর ছয়শ শ্রমিকের অর্জিত ছুটির টাকা পরিশোধের মধ্য দিয়ে একটি দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হয়েছিল। শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা আদায়ের এই ঘটনা হয়তো বড় কোনো সংবাদ শিরোনাম হয়নি। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে এমন ঘটনাগুলোরও রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব।

কারণ, শ্রমিকের প্রাপ্য অধিকার যখন সংগঠিত উদ্যোগে বাস্তবে ফিরে আসে, তখন শুধু একজন শ্রমিক নন—শক্তি পান আরও অনেক শ্রমিক। আর সেই অভিজ্ঞতাই ভবিষ্যতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়।

যে গল্পগুলো লেখা হয়নি, সেগুলো আসলে শ্রমিকের অধিকার আদায়ের নীরব ইতিহাস।