যে গল্পগুলো লেখা হয়নি–২১: ফজলুল কবির মিন্টু
![]()
একটা হতাশা মিশ্রিত সফলতা
আদালতের স্থগিতাদেশেও কর্মস্থলে ফেরা হলো না শ্রমিকদের
১৪ জুলাই ২০২২
ট্রেড ইউনিয়ন করা কি অপরাধ? শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের জন্য সংগঠিত হওয়াই কি তাদের শাস্তি পাওয়ার কারণ হবে? আইন যেখানে শ্রমিকের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলে, সেখানে সেই আইনকে আশ্রয় করেও যদি শ্রমিককে কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনা না যায়, তাহলে আইনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
২০২২ সালের ১৪ জুলাইয়ের এই ঘটনাটি আমাকে একদিকে যেমন কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিল, অন্যদিকে তেমনি গভীর হতাশায় ডুবিয়েছিল।
জনসন নিকলসন ঠিকাদার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. রুবেল ও সাধারণ সম্পাদক মো. আলীসহ আরও দুজন শ্রমিককে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় বদলি করে দেয়। তাদের অপরাধ একটাই—তারা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করেছিলেন। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানার পরই তাদের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নেয়।
শ্রমিকদের কাছে বিষয়টি ছিল স্পষ্টতই ইউনিয়ন করার শাস্তি। আর আমাদের কাছে এটি ছিল শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার এবং ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রমের ওপর সরাসরি আঘাত।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৮৭ ধারার আলোকে এই বদলি আদেশকে বেআইনি ও ইউনিয়ন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ হিসেবে চ্যালেঞ্জ করা হয়। প্রথমে মালিকপক্ষের কাছে গ্রিভ্যান্স দরখাস্ত দেওয়া হয়। কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান না হওয়ায় আইনি লড়াইয়ের পথে হাঁটতে হয়।
চট্টগ্রাম শ্রম আদালতের অভিজ্ঞ আইনজীবী অ্যাডভোকেট সেলিম ভাইয়ের মাধ্যমে মামলা দায়ের করা হয়। বিজ্ঞ আদালত বদলি আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। আমরা আশা করেছিলাম, এবার অন্তত শ্রমিকেরা তাঁদের কর্মস্থলে ফিরে যেতে পারবেন। আদালতের আদেশ তাঁদের ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করবে।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
আদালতের স্থগিতাদেশ পাওয়ার পরও শ্রমিকেরা কর্মস্থলে প্রবেশ করতে পারেননি। যে আইনি প্রতিকার তাঁদের কাজে ফেরার পথ খুলে দেওয়ার কথা, সেটি বাস্তবে তাঁদের সেই সুযোগ নিশ্চিত করতে পারল না। কাগজে-কলমে আইনি লড়াইয়ে একটি অগ্রগতি অর্জিত হলেও বাস্তবে শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলো না।
তখন আমাদের সামনে আর কী বিকল্প ছিল?
আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু এই লড়াই ছিল অসম। একদিকে প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা, অন্যদিকে জীবিকার অনিশ্চয়তায় থাকা কয়েকজন শ্রমিক। শ্রম আদালতে দীর্ঘসূত্রতা এবং মামলা পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা শ্রমিকদের মনে খুব বেশি আশার সঞ্চার করত না। দিনের পর দিন মামলা চালিয়ে যাওয়ার আর্থিক ও মানসিক চাপ বহন করাও তাঁদের পক্ষে কঠিন ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ চাকরির ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাঁদের টারমিনেশনের প্রস্তাব দেয়। শেষ পর্যন্ত অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের বাস্তবতা বিবেচনায় শ্রমিকেরা সেই প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হন। এর ফলে প্রত্যেকে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা করে পান।
একটি দিক থেকে এটি ছিল অর্জন। শ্রমিকেরা অন্তত তাঁদের চাকরির ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পেরেছিলেন। তাঁদের পাশে থেকে সেই অর্থ আদায়ে সহযোগিতা করতে পারাকে আমি আংশিক সফলতা হিসেবেই দেখি।
কিন্তু এই সফলতার মধ্যেও রয়ে গেল গভীর হতাশা।
আমরা চেয়েছিলাম, শ্রমিকেরা তাঁদের কর্মস্থলে ফিরে যাবেন। তাঁরা কাজ করবেন, সংগঠন করবেন এবং আইনসম্মতভাবে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়ে যাবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁদের চাকরি রক্ষা করা গেল না। আদালতের স্থগিতাদেশ পেয়েও তাঁদের কর্মস্থলে যোগদান করাতে পারলাম না।
আমার মনে বারবার প্রশ্ন জেগেছে—শ্রম আদালত যদি আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত, শ্রম দপ্তর যদি আরও জোরালোভাবে এগিয়ে আসত, কিংবা আমাদের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন যদি আরও শক্তিশালী হতো, তাহলে কি এই পরিণতি এড়ানো সম্ভব হতো না?
হয়তো তখন গল্পটা অন্য রকম হতে পারত। হয়তো শ্রমিকেরা ক্ষতিপূরণ নিয়ে চাকরি ছাড়তে বাধ্য না হয়ে নিজেদের কর্মস্থলে ফিরে যেতে পারতেন। তাঁদের এই অভিজ্ঞতা অন্য শ্রমিকদেরও সংগঠিত হওয়ার সাহস জোগাতে পারত।
তবে এই ঘটনার দায় এককভাবে কোনো একটি পক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও সহজ নয়। আইনের প্রয়োগ, আদালতের আদেশ কার্যকর করার ব্যবস্থা, শ্রম দপ্তরের ভূমিকা এবং ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সাংগঠনিক শক্তি—সবকিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের আদেশ বাস্তবে কার্যকর না হলে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আজও ভাবি, এটি কি আইনের দুর্বলতা, নাকি আমাদের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের ব্যর্থতা? নাকি আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকার অভাব? হয়তো সময়ই এসব প্রশ্নের উত্তর দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—শ্রমিকের অধিকার শুধু আইনে স্বীকৃত থাকলেই হবে না, বাস্তবেও তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিলসের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের এই লড়াইয়ে সার্বিক সহযোগিতা দিতে পেরেছি, এটাই আমার গর্ব। তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি, তাঁদের আইনি প্রতিকার পাওয়ার পথ তৈরি করতে সহযোগিতা করেছি এবং শেষ পর্যন্ত চাকরির ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রক্রিয়ায় পাশে থেকেছি।
তবু আমার কাছে সফলতার প্রকৃত অর্থ শুধু ক্ষতিপূরণের টাকা হাতে তুলে দেওয়া নয়। প্রকৃত সফলতা হলো, শ্রমিক তাঁর চাকরি হারাবেন না, ইউনিয়ন করার কারণে প্রতিশোধের শিকার হবেন না এবং আদালতের আশ্রয় নিলে ন্যায়বিচার পাবেন।
সেদিন সেই পূর্ণ সফলতা অর্জন করতে পারিনি। তাই অর্জনের আনন্দের পাশাপাশি রয়ে গেছে অপূর্ণতার বেদনা।
ছবিতে আমার সঙ্গে জনসন নিকলসন ঠিকাদার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. রুবেল ও সাধারণ সম্পাদক মো. আলীকে দেখা যাচ্ছে। ছবিটি শুধু একটি আইনি লড়াইয়ের স্মৃতি নয়; এটি শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, সীমাবদ্ধতার মধ্যে অর্জিত সাফল্য এবং অপূর্ণ প্রত্যাশারও সাক্ষী।
আমি বিশ্বাস করি, এই অভিজ্ঞতা আমাদের আরও সংগঠিত হতে শেখাবে, আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করার দাবি জোরালো করবে এবং শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করবে।
আজকের এই আংশিক সফলতা আগামী দিনের বড় অর্জনের পথ দেখাক—এটাই প্রত্যাশা।