যে গল্পগুলো লেখা হয়নি – ২০: ফজলুল কবির মিন্টু
রশির টানে হাতের চার আঙুল হারানো ওয়াহাবের লড়াই
![]()
জামালপুরের ওয়াহাব আলী প্রায় ৩১ বছর ধরে শিপ ব্রেকিং সেক্টরে কাজ করছেন। জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন জাহাজভাঙা শিল্পের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে। কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, স্বপ্ন দেখতেন পরিবার নিয়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকার। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা তাঁর জীবনের স্বাভাবিক গতিপথ বদলে দেয়।
২০২১ সালের ১০ জুলাই সীতাকুণ্ডের মাদাম বিবিরহাটে অবস্থিত এস এন কর্পোরেশনে পাম্প অপারেটর হিসেবে কাজে যোগ দেন ওয়াহাব আলী। সেখানে কাজ করার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায়, ১৪ জুলাই দুপুর ১টার দিকে ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
ওয়াহাব আলীর ভাষ্যমতে, ঘটনার দিন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি প্রতিনিধি দল একটি বাঙ্কার নিয়ে এস এন কর্পোরেশনের জাহাজ পরিদর্শনে গিয়েছিল। বাঙ্কারটিকে একটি বড় জাহাজের সঙ্গে রশি দিয়ে বাঁধা হচ্ছিল। কিন্তু রশিটি প্রয়োজনের তুলনায় ছোট ছিল। ওয়াহাব বাঙ্কারের লোকজনকে রশি ঢিলা করার অনুরোধ করেন। কিন্তু রশি ছোট হওয়ায় তা আর ঢিলা করা সম্ভব হয়নি।
বড় জাহাজের সঙ্গে বাঙ্কারটি বাঁধার কাজ করছিলেন ওয়াহাব নিজেই। হঠাৎ কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই রশিটি ছিঁড়ে যায়। রশির প্রচণ্ড টানে তাঁর ডান হাতের তালুর মাঝ বরাবর থেকে চারটি আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
এক মুহূর্তেই বদলে যায় ওয়াহাবের জীবন। যে হাত দিয়ে এত বছর কাজ করে সংসার চালিয়েছেন, সেই হাতই হয়ে ওঠে তাঁর অসহায়ত্বের কারণ।
দুর্ঘটনার পরও জোটেনি তাৎক্ষণিক চিকিৎসা
ওয়াহাবের বর্ণনা অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পর নৌবাহিনীর পরিদর্শক দলের নজর এড়াতে তাঁকে জাহাজের ভেতরে একটি গোপন স্থানে প্রায় দেড় ঘণ্টা বিনা চিকিৎসায় লুকিয়ে রাখা হয়। তখন জাহাজটি ছিল হাতিয়া চ্যানেলের আউটার এলাকায়।
দুপুর ১টার দিকে আহত হলেও তাঁকে চট্টগ্রামে পৌঁছাতে রাত ৮টা বেজে যায়। পরে তাঁকে ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং অস্ত্রোপচার করা হয়।
একজন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে মারাত্মক আহত হলেন, তাঁর হাতের চারটি আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল—এমন পরিস্থিতিতে তাঁর দ্রুত চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং ভবিষ্যৎ জীবিকার নিশ্চয়তা দেওয়াই ছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কিন্তু ওয়াহাবের অভিযোগ অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তি ও অস্ত্রোপচারের পর এস এন কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে আর কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। চিকিৎসার খরচও দেওয়া হয়নি।
কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগ না পেয়ে অসহায় হয়ে পড়েন ওয়াহাব। কীভাবে নিজের অধিকার আদায় করবেন, কোথায় গেলে সহায়তা পাবেন—কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না।
বিলসের কাছে ওয়াহাবের ছুটে আসা
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ মুক্ত শ্রমিক ফেডারেশনের দুই সংগঠক মো. ইদ্রিছ ও মো. শহিদের মাধ্যমে ১৫ সেপ্টেম্বর ওয়াহাব আলী বিলস অফিসে আসেন। তাঁর কাছ থেকে দুর্ঘটনার বিস্তারিত শোনার পর আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করি।
বিলসের পক্ষ থেকে মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে জানানো হয়, ওয়াহাব তাঁদের প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক নন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি প্রতিষ্ঠানের একজন ঠিকাদারের অধীনে অন্য এক প্রকৌশলীর মাধ্যমে কাজ করতেন।
আমরা ওই প্রকৌশলীর সঙ্গেও যোগাযোগ করি। তাঁদের জানিয়ে দিই, প্রাথমিকভাবে বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তাঁরা সমাধান দিতে ব্যর্থ হলে আমরা আইনি পথে হাঁটব।
আমাদের উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার—কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত একজন শ্রমিক যেন তাঁর ন্যায্য ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত না হন।
এক লাখ টাকায় সমঝোতা, কিন্তু কতটা ন্যায্য হলো?
বিলসের পক্ষ থেকে যোগাযোগের পর মালিকপক্ষ বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পারে। কিন্তু আমাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে তারা আহত শ্রমিক ওয়াহাব আলীকে সরাসরি ডেকে নিয়ে এক লাখ টাকা দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করে ফেলে। একই সঙ্গে ওয়াহাবের শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী ভবিষ্যতে তাঁকে চাকরি দেওয়ার মৌখিক প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ওয়াহাব সেই চাকরি পেয়েছিলেন কি না, তা আর জানা হয়নি।
ওয়াহাব অন্তত এক লাখ টাকা পেয়েছিলেন—এটুকু ছিল স্বস্তির বিষয়। কিন্তু তাঁর মতো একজন শ্রমিক, যিনি প্রায় ৩১ বছর ধরে এই খাতে কাজ করেছেন এবং কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ডান হাতের চারটি আঙুল হারিয়েছেন, তাঁর ভবিষ্যৎ জীবিকার ক্ষতি কি এক লাখ টাকায় পূরণ করা সম্ভব?
আমরা যদি সমঝোতার প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকতে পারতাম, তাহলে হয়তো তাঁর জন্য আরও বেশি ক্ষতিপূরণ আদায় করা সম্ভব হতো। অন্তত তাঁর চিকিৎসা, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং ভবিষ্যৎ জীবিকার বিষয়গুলো নিয়ে আরও জোরালোভাবে আলোচনা করা যেত।
প্রমাণহীন শ্রমিকের অধিকার আদায়ের কঠিন বাস্তবতা
ওয়াহাবের ঘটনাটি আমাদের সামনে শ্রমিক অধিকার আদায়ের একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে। তিনি যখন আমাদের কাছে এসেছিলেন, তখন তাঁর কাছে কোনো পরিচয়পত্র ছিল না, নিয়োগপত্রও ছিল না। এমনকি তিনি ওই প্রতিষ্ঠানে মাত্র পাঁচ দিন কাজ করেছিলেন।
প্রায় ৩১ বছরের কর্মজীবন থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে তাঁর কর্মসংস্থানের প্রমাণ দেখানোর মতো কোনো কাগজপত্র তাঁর হাতে ছিল না। ফলে আইনি পথে গেলে তাঁর কর্মসম্পর্ক প্রমাণ করা এবং ক্ষতিপূরণ আদায় করা কঠিন হয়ে পড়তে পারত।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে—একজন শ্রমিকের নিয়োগপত্র নেই, পরিচয়পত্র নেই, কাজের লিখিত প্রমাণ নেই বলে কি কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর তাঁর অধিকার দুর্বল হয়ে যাবে? শ্রমিকের নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব কি কেবল কাগজপত্রের ওপর নির্ভর করবে?
কর্মক্ষেত্রে নিয়োগের লিখিত প্রমাণ সংরক্ষণ করা যেমন জরুরি, তেমনি দুর্ঘটনার পর শ্রমিকের চিকিৎসা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করাও জরুরি। ঠিকাদার বা মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে মূল প্রতিষ্ঠান যেন দায় এড়াতে না পারে, সে বিষয়েও কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
ওয়াহাবের ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত এক লাখ টাকার সমঝোতায় থেমে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁর চারটি আঙুল হারানোর ক্ষতি, ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের অনিশ্চয়তা এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রশ্নগুলোর পূর্ণাঙ্গ সমাধান হয়েছিল কি না, তা অজানাই রয়ে গেছে।
এই গল্পটি শুধু ওয়াহাব আলীর নয়। এটি সেইসব শ্রমিকের গল্প, যাঁরা বছরের পর বছর ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেন, দুর্ঘটনায় আহত হন, অথচ নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রটুকুও হাতে পান না।
এমন অনেক ওয়াহাব আলী আছেন, যাঁদের জীবনের গল্প কখনো লেখা হয় না। তাঁদের ক্ষতবিক্ষত শরীর, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর নীরব কান্নার আড়ালে চাপা পড়ে থাকে শ্রমিক অধিকারের বহু অমীমাংসিত প্রশ্ন।
সেই না-বলা গল্পগুলোই তুলে ধরার চেষ্টা—যে গল্পগুলো লেখা হয়নি।