যে গল্পগুলো লেখা হয়নি–১৯: ফজলুল কবির মিন্টু

বেসরকারি স্বাস্থ্য শ্রমিক আবু তৈয়বের চাকরি পুনর্বহাল

সেপ্টেম্বর ২০২২

কর্মক্ষেত্রে একজন শ্রমিকের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়োগকর্তার দায়িত্ব। অথচ অনেক সময় কর্মস্থলে অন্যায়ের শিকার হয়েও শ্রমিকেরা প্রতিবাদ করার সাহস পান না। চাকরি হারানোর ভয়, পরিবারের ভরণপোষণের দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাঁদের নীরবে সবকিছু সহ্য করতে বাধ্য করে। তবে কখনো কখনো সম্মিলিত উদ্যোগ ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অন্যায়ের প্রতিকার পাওয়া সম্ভব হয়।

আবু তৈয়ব তেমনই একজন শ্রমিক।

চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে কাজ করতেন আবু তৈয়ব। গত জুন মাসে কর্মস্থলে একজন চিকিৎসকের হাতে মারধরের শিকার হন তিনি। শুধু মারধর করেই ক্ষান্ত হননি ওই চিকিৎসক, তাঁকে কর্মস্থল থেকেও বের করে দেওয়া হয়। অপমান, শারীরিক নির্যাতন আর চাকরি হারানোর অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন এই বেসরকারি স্বাস্থ্য শ্রমিক।

একজন শ্রমিকের জন্য চাকরি শুধু আয়ের উৎস নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের বেঁচে থাকা, দৈনন্দিন খরচ মেটানো এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন। তাই আবু তৈয়বের চাকরি হারানোর ঘটনাটি কেবল একজন ব্যক্তির কর্মসংস্থান হারানোর বিষয় ছিল না, এটি ছিল কর্মক্ষেত্রে একজন শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার প্রশ্ন।

ঘটনাটি শ্রম অধিকারসংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া তথা শ্রম আইনের ১২৪ক ধারায় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর বরাবর উত্থাপিত হয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে অনুষ্ঠিত হয় ত্রিপক্ষীয় সভা। সেখানে সালিশি বৈঠকের মাধ্যমে আবু তৈয়বের চাকরিতে পুনর্বহালের বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়।

সভায় শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে আমিও উপস্থিত ছিলাম। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন শ্রম পরিদর্শক ফিহ্ন ছন্দ।

আলোচনা ও সালিশি প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে আসে কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্ত। চাকরি হারানোর পর দুই মাস ১৯ দিন পেরিয়ে গেলেও আবু তৈয়বকে তাঁর কর্মস্থলে পুনর্বহাল করা হয়। শুধু তাই নয়, ওই সময়ের বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং চাকরির ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়।

আবু তৈয়বের জন্য এটি ছিল স্বস্তি ফিরে পাওয়ার দিন। দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর আবারও কর্মজীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হলো তাঁর সামনে। আর শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা মানুষের কাছে এমন একটি সমাধান নিঃসন্দেহে আনন্দের।

তবে এই ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি প্রশ্নও সামনে আসে—একজন শ্রমিককে কেন কর্মস্থলে মারধরের শিকার হয়ে চাকরি হারাতে হবে? কেন নিজের ন্যায্য অধিকার ফিরে পেতে তাঁকে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হবে?

কর্মক্ষেত্রে কোনো শ্রমিকের সঙ্গে অন্যায় আচরণ, শারীরিক নির্যাতন কিংবা বেআইনিভাবে চাকরিচ্যুত করার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষা এবং তাঁর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা শুধু আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়, এটি মানবিক দায়িত্বও।

আবু তৈয়বের চাকরি পুনর্বহালের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শ্রমিকের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে ধৈর্য, সংগঠিত উদ্যোগ এবং যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার গুরুত্ব রয়েছে। সব সমস্যার সমাধান হয়তো সহজে আসে না, কিন্তু অন্যায়ের প্রতিকার চাওয়ার পথটি কখনো বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়।

আবু তৈয়বের চাকরিতে ফিরে যাওয়ার ঘটনাটি হয়তো বড় কোনো সংবাদ হয়ে ওঠেনি। কিন্তু একজন শ্রমিকের জীবনে এর গুরুত্ব ছিল অনেক। এমন অসংখ্য শ্রমিকের অধিকার আদায়ের ছোট ছোট সাফল্যের গল্পই আমাদের শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম ও সম্ভাবনার কথা বলে।

এ রকম আরও অনেক গল্প আছে, যেগুলো সংবাদপত্রের পাতায় স্থান পায় না, আলোচনার কেন্দ্রেও আসে না। অথচ প্রতিটি গল্পের পেছনে থাকে একজন মানুষের জীবন, তাঁর বেঁচে থাকার লড়াই এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

সেই গল্পগুলোই তুলে ধরার চেষ্টা—যে গল্পগুলো লেখা হয়নি।