যে গল্পগুলো লেখা হয়নি–১৭: ফজলুল কবির মিন্টু
এক মাসের লড়াই ৮০% অর্জন
![]()
ঘটনাকাল: নভেম্বর–ডিসেম্বর ২০২২
কখনো কখনো মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় আসে, যখন বেঁচে থাকার জন্যই লড়াই করতে হয়। আর সেই মানুষটি যদি হন একজন নারী শ্রমিক, বয়সের ভারে যাঁর শরীর কিছুটা নুয়ে পড়েছে, নিজের বলতে যাঁর কোনো জমিজমা নেই, তাহলে সেই লড়াই আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তবু তাঁরা লড়েন, কারণ তাঁদের বেঁচে থাকতে হয়, সংসার চালাতে হয়।
কৃষ্ণা বিশ্বাস ও জ্যোতি রাণি পাল—দুজন নারী শ্রমিক। জীবনের দীর্ঘ সময় তাঁরা কাটিয়েছেন পোশাক কারখানায় কাজ করে। অথচ কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁদেরই লড়তে হয়েছে চাকরি থেকে অন্যায়ভাবে বের করে দেওয়ার বিরুদ্ধে, নিজেদের ন্যায্য পাওনা আদায়ের জন্য।
শকুনের নজর পড়েছে কৃষ্ণার ওপর
২৯ নভেম্বর ২০২২। দুপুরে চট্টগ্রাম বিলস অফিসে বসে কাজ করছিলাম। এমন সময় কৃষ্ণা বিশ্বাস নামে একজন নারী শ্রমিক এলেন। বয়স ৪৫–৪৬ বছর হবে। কিন্তু চেহারায় যেন বয়সের ছাপ আরও বেশি। জীবনের যৌবনকালজুড়ে পোশাক কারখানায় কাজ করেছেন। তখন তিনি আজিম গ্রুপের অর্কিড স্যুয়েটার লিমিটেডের ফিনিশিং সেকশনে কর্মরত। মাস শেষে সব মিলিয়ে তাঁর মজুরি মাত্র ১০ হাজার ৫০০ টাকা।
কৃষ্ণার অভিযোগ, কারখানার কিছু কর্মকর্তা বয়স বেশি হয়ে যাওয়া শ্রমিকদের চাকরি ছাড়তে বাধ্য করার চেষ্টা করেন। তাঁদের লক্ষ্য, কোনোভাবে এসব শ্রমিককে কারখানা থেকে বের করে দেওয়া। এবার তাঁদের নজর পড়েছে কৃষ্ণার ওপর।
বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও তাঁকে সরাতে না পেরে একপর্যায়ে তাঁকে ১৬ নভেম্বর থেকে ১০ দিনের ছুটি দেওয়া হয় এবং ২৬ নভেম্বর কাজে যোগ দিতে বলা হয়। কৃষ্ণা নির্ধারিত দিনে কারখানায় গেলে তাঁর পরিচয়পত্র কেড়ে নিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়, তাঁর আর চাকরি নেই, তাঁকে আর কারখানায় আসতে হবে না।
বিষয়টি জানার পর সেদিনই কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের হটলাইনে ফোন করে অভিযোগ জানালাম। অভিযোগ নম্বর ৭৪।
এটি শুধু একটি অভিযোগ ছিল না; শুরু হয়েছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে আরেকটি লড়াই।
জ্যোতি রাণি পালের কান্না
১ ডিসেম্বর ২০২২। বিলস অফিসে এলেন আরেক নারী শ্রমিক—জ্যোতি রাণি পাল।
এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। স্বামী মারা গেছেন বহু বছর আগে। এরপর থেকে একাই সংসারের হাল ধরেছেন। বাড়ি সন্দ্বীপ। একসময় গ্রামের যে ভিটেমাটি ছিল, সমুদ্রের ভাঙনে তা-ও হারিয়ে গেছে। ভূমিহীন জ্যোতি সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ২০০৪ সালের মে মাসে যোগ দিয়েছিলেন অর্কিড স্যুয়েটার লিমিটেডে। দীর্ঘ ১৮–১৯ বছর ধরে সেখানে কাজ করেছেন।
কিন্তু বয়স বেড়েছে। আগের মতো দ্রুত কাজ করতে পারেন না। আর এই বয়সই যেন তাঁর অপরাধ!
জ্যোতির অভিযোগ, তাঁকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করার জন্য নানা ধরনের চাপ দেওয়া হচ্ছিল। ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে তাঁকে এক ঘণ্টার জন্যও ওভারটাইম দেওয়া হয়নি। আয় কমে গেলে হয়তো তিনি নিজেই চাকরি ছেড়ে চলে যাবেন—কর্তৃপক্ষ এমনটাই ভেবেছিল। কিন্তু তাতে কাজ না হওয়ায় ১ নভেম্বর তাঁকে ১০ দিনের ছুটি দেওয়া হয়।
১১ নভেম্বর শুক্রবার থাকায় তিনি ১২ নভেম্বর শনিবার কাজে যোগ দেন। আরও এক সপ্তাহ কাজ করার পর তাঁর পরিচয়পত্র কেড়ে নিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়, তাঁর আর চাকরি নেই।
বিলস অফিসে এসে জ্যোতি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিলেন না। আমার কাছে এসে যেন একটু ভরসা পেলেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, “স্যার, ওরা বলে আমার কারণে নাকি মালিকের অনেক লস হচ্ছে। আমি বললাম, ১৮–১৯ বছর চাকরি করেছি, এতদিন লস হয়নি, এখন লস হবে কেন?”
চোখ মুছতে মুছতে আরও বললেন, “তাদের যদি আমাকে ভালো না লাগে, তাহলে আমার পাওনা দিয়ে বের করে দিলেই তো হয়। আমার থাকার জন্য এক টুকরো নিজের জায়গাও নাই। টাকাগুলো পেলে অন্তত কিছু করে খাওয়ার চেষ্টা করব।”
কথাগুলো শুনে মনটা ভারী হয়ে গেল। একজন মানুষ জীবনের প্রায় দুই দশক একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর শেষ পর্যন্ত নিজের প্রাপ্যটুকু পাওয়ার জন্য কাঁদবেন—এ কেমন বাস্তবতা!
হিসাব করে দেখলাম, জ্যোতি রাণি প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা পাওয়ার কথা। তাঁর ন্যায্য পাওনা আদায়ের জন্য কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে অভিযোগ দায়ের করলাম। শুরু হলো দ্বিতীয় লড়াই।
পরিচয়পত্র ফিরল, কিন্তু প্রশ্নের উত্তর মিলল না
৬ ডিসেম্বর ২০২২। কিছুটা স্বস্তির খবর পেলাম। কৃষ্ণা বিশ্বাসের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া পরিচয়পত্রটি আগের দিন ফেরত দিয়েছে অর্কিড স্যুয়েটার কর্তৃপক্ষ। কিন্তু জ্যোতি রাণির পরিচয়পত্র ফেরত দেওয়া হয়নি। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, তাঁর পরিচয়পত্র নাকি হারিয়ে গেছে।
আমার প্রশ্ন ছিল, কোনো শ্রমিককে ছাঁটাই করা হোক বা অন্য কোনোভাবে চাকরির অবসান ঘটানো হোক, তাঁর চূড়ান্ত পাওনা পরিশোধের বিষয়টি নিষ্পত্তি না করে এভাবে পরিচয়পত্র কেড়ে নেওয়ার অধিকার কি কর্তৃপক্ষের আছে? আর যদি তা না থাকে, তাহলে যাঁরা এমন কাজের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে না কেন?
কৃষ্ণার পরিচয়পত্র ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে সার্বিক সহযোগিতার জন্য বিলসের প্যারালিগ্যাল সদস্য ও শ্রমিকনেতা লুৎফা সোনিয়াকে ধন্যবাদ জানালাম।
কিন্তু পরিচয়পত্র ফেরত পাওয়াই তো শেষ কথা নয়। তাঁদের চাকরি থেকে বের করে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।
ছাঁটাই কি আইনসম্মত হয়েছিল?
৭ ডিসেম্বর ২০২২। কৃষ্ণা বিশ্বাস ও জ্যোতি রাণি পালকে ৫ ডিসেম্বর নভেম্বর মাসের ২৬ দিনের মজুরি দেওয়া হয়েছিল।
এখানে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এল। দুজনকেই নভেম্বর মাসে ১০ দিন করে ছুটি দেওয়া হয়েছিল। আবার জ্যোতি রাণিকে ২১ নভেম্বরের পর থেকে কারখানায় যেতে নিষেধ করা হয়েছিল। অথচ তাঁদের ছাঁটাই কার্যকর দেখানো হয়েছিল ২৭ নভেম্বর থেকে। সে হিসাবে দুজনকেই ২৬ দিনের মজুরি দেওয়া হয়।
কেন তাঁদের ছুটি দেওয়া হয়েছিল? কেন পরিচয়পত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছিল? জ্যোতি রাণিকে কাজে যেতে নিষেধ করার পরও কেন ছাঁটাইয়ের তারিখ ২৭ নভেম্বর দেখানো হলো? এসব প্রশ্নের জবাব কি কর্তৃপক্ষের দেওয়ার কথা নয়?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল তাঁদের চাকরির মেয়াদ। কৃষ্ণা বিশ্বাসের চাকরির বয়স ১০ বছরের বেশি, আর জ্যোতি রাণি পালের প্রায় ১৯ বছর। তাঁদের ক্ষেত্রে শ্রম আইনের বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা জরুরি ছিল।
আমরা আরও জানতে পারি, আজিম গ্রুপের অর্কিড স্যুয়েটারসহ দুটি কারখানা থেকে মোট ৪৬ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। সেই হিসাবে অর্কিড স্যুয়েটার থেকে প্রায় ২৩–২৪ জন শ্রমিক ছাঁটাই হয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘ ১৮–১৯ বছরে কি ওই কারখানায় মাত্র ২৩–২৪ জন শ্রমিক নিয়োগ পেয়েছিলেন? আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় হিসাবটি মেলেনি।
তাই প্রশ্ন তুললাম, কৃষ্ণা বিশ্বাস ও জ্যোতি রাণি পালকে ছাঁটাই করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শ্রম আইনের ২০ ধারার বিধান অনুসরণ করা হয়েছিল কি না?
কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে আমাদের বার্তা ছিল স্পষ্ট—আইনের বিধান লঙ্ঘন করা হলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। লড়াই চলবে।
ত্রিপক্ষীয় সভায় শ্রমিকদের পক্ষে
২৬ ডিসেম্বর ২০২২। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় সভায় উপস্থিত হলাম। সেখানে ভুক্তভোগী শ্রমিক কৃষ্ণা বিশ্বাস ও জ্যোতি রাণি পালের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করলাম। আমাদের দাবি ছিল, তাঁদের পাওনা যথাযথভাবে নির্ধারণ ও পরিশোধ করতে হবে এবং চাকরি থেকে অবসানের আইনগত দিকগুলোও খতিয়ে দেখতে হবে।
একজন শ্রমিকের পাওনা আদায়ের লড়াই কেবল টাকার অঙ্কের লড়াই নয়। এটি তাঁর শ্রমের স্বীকৃতি, মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকারের লড়াই। বছরের পর বছর একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর একজন শ্রমিক যেন অসম্মানিত হয়ে, অসহায় অবস্থায় কর্মজীবন থেকে বিদায় নিতে বাধ্য না হন—সেই প্রশ্নটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
এক মাসের লড়াইয়ে ৮০ শতাংশ অর্জন
২৭ ডিসেম্বর ২০২২। অবশেষে কিছুটা সাফল্য এল।
কৃষ্ণা বিশ্বাস পেলেন ৭৪ হাজার ৮০০ টাকা। জ্যোতি রাণি পাল পেলেন ১ লাখ ৯ হাজার ২০০ টাকা। এক মাসের প্রচেষ্টা ও দৌড়ঝাঁপের পর তাঁদের হাতে কিছু টাকা তুলে দেওয়া সম্ভব হলো।
আমরা কর্তৃপক্ষকে চেকের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করার অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তারা চেকের মাধ্যমে অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে টাকা পাওয়া গেলেও পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু প্রশ্ন থেকেই গেল।
সেদিন মনে হয়েছিল, দীর্ঘদিনের বঞ্চনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করতে পেরেছি। তবে এটিকে পূর্ণ বিজয় বলার সুযোগ ছিল না।
দুটি প্রশ্ন তখনো অমীমাংসিত:
১. কৃষ্ণা বিশ্বাস ও জ্যোতি রাণি পালকে ছাঁটাই করার প্রক্রিয়া আইনসম্মত ছিল কি না?
২. কৃষ্ণার প্রায় ১০ বছরের এবং জ্যোতি রাণির প্রায় ১৮ বছরের চাকরির বিপরীতে তাঁরা আইন অনুযায়ী চাকরির ক্ষতিপূরণ, গ্র্যাচুইটি বা অন্য কোনো প্রাপ্য সুবিধা পাওয়ার অধিকারী কি না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা এবং তাঁদের প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের প্রস্তুতি চলছিল। আমাদের লক্ষ্য ছিল, শুধু কিছু টাকা হাতে তুলে দিয়েই যেন লড়াই শেষ না হয়; বরং তাঁদের আইনগত অধিকার কতটুকু নিশ্চিত হলো, সেটিও স্পষ্ট করা।
এই লড়াইয়ে বিলস চট্টগ্রাম যুব নেটওয়ার্কের সদস্যরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছেন। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।
শেষ কথা
কৃষ্ণা বিশ্বাস ও জ্যোতি রাণি পালের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় পার করার পর বয়স বেড়ে গেলে শ্রমিকদের বোঝা মনে করা, তাঁদের চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা এবং ন্যায্য পাওনা আদায়ের জন্য তাঁদের অসহায়ভাবে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে বাধ্য করা—এমন বাস্তবতা আমাদের শ্রমজগতের কঠিন এক চিত্র তুলে ধরে।
এক মাসের লড়াইয়ে আমরা ৮০ শতাংশ অর্জন করেছি। বাকি ২০ শতাংশ অর্জনের জন্য তখনো পথ চলা বাকি। কারণ, আমাদের কাছে বিজয় মানে শুধু টাকা আদায় নয়; বিজয় মানে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
কৃষ্ণা ও জ্যোতি রাণির লড়াই তাই শুধু দুজন নারী শ্রমিকের লড়াই নয়। এটি সেই সব শ্রমিকের লড়াই, যাঁরা জীবনের সেরা সময়টুকু শ্রম দিয়ে কাটিয়ে শেষ বয়সে এসে নিজেদের ন্যায্য পাওনা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন।
ন্যায্য অধিকার ভিক্ষা নয়, শ্রমিকের প্রাপ্য। আর সেই প্রাপ্য আদায়ের লড়াইয়ে এক বিন্দুও ছাড় দেওয়া হবে না।
লড়াই চলবে।