বিজন ভাবনা(৬৫): যুদ্ধের মতি গতি -বিজন সাহা
![]()
ইউক্রেনের উপর রাশিয়া আক্রমণ জোরদার করার পর অনেকেই ফোন করছে পরিস্থিতি জানার জন্য। অবশ্য তারা মূলত খবর পাচ্ছে পশ্চিমা মাধ্যম থেকে যা জানাচ্ছে কীভাবে ইউক্রেন রাশিয়ার উপর ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, তাই তাদের ফোন করার আরেকটি উদ্দেশ্য আমরা এর মধ্যে কীভাবে টিকে আছি সেটা জানা? আগে অবশ্য অনেকেই অভিযোগ করত কেন রাশিয়া আমেরিকা বা ইসরাইলের মত হামলা চালিয়ে ইউক্রেনের সব কিছু ধ্বংস করছে না। তাদের বলতাম, সব দেশ নিজ নিজ ঐতিহ্য অনুযায়ী যুদ্ধ করে। ১৮১২ বা ১৯৪৫ সালের পিতৃভূমির যুদ্ধের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখব যে পশ্চিমারা রাশিয়া আক্রমণ করে সাধারণ মানুষের উপর প্রচণ্ড অত্যাচার করেছে আর শেষ পর্যন্ত রাশিয়া যখন এসব দেশে জয় করেছে সাধারণ মানুষ মূলত তেমন কোন আক্রমণের শিকার হয়নি। এটা কথার কথা নয়, ঐতিহাসিক সত্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ২৬,৬ মিলিয়ন মানুষ মারা যায়। সেই যুদ্ধে সোভিয়েত সেনা মারা যায় ৬.৯ মিলিয়ন আর ৪.৫৬ মিলিয়ন নিখোঁজ হয়। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি ৪.৩ মিলিয়ন সেনা হারায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রায় ২০ মিলিয়ন বেসামরিক মানুষের সবাই যে জার্মান (আসলে শুধু জার্মান নয়, সমস্ত কন্টিনেটাল ইউরোপের সেনা ছিল সেখানে) সেনাদের হাতে মারা গেছে তা নয়, তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের যেসব এলাকা শত্রু সেনারা দখল করে নেয় সেখানে অত্যাচারের যে চিহ্ন তারা রেখে গেছে তাতে হিটলার বা জার্মান বাহিনী যে সাধারণ মানুষ হত্যা করার পরিকল্পনা নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করেছিল তাতে সন্দেহ থাকে না, নেই। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন বার্লিন পর্যন্ত পৌঁছে তখন সেরকম ঘটনার কোন প্রমাণ তেমন পাওয়া যায় না। ইতিহাস বলে পোল্যান্ড, চেকোস্লোভাকিয়া এসব দেশের লোকজন সোৎসাহে রেড আর্মিকে সম্বর্ধনা জানায় যদিও এসব দেশের সেনারাও জার্মান বাহিনীর সাথে সোভিয়েত জনগণের উপর নির্মম অত্যাচার চালিয়েছিল। তাই বলা যায় বেসামরিক নাগরিক হত্যা সোভিয়েত বা রাশিয়ার মেথড নয়। আর এ কারণেই যুদ্ধের পঞ্চম বছরে পা দিয়েও তারা বেসামরিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারে হামলা করেনি। জেলেনস্কি ঘোষণা দিয়ে ওয়াইল্ড বেরিস সহ অন্যান্য সিভিল মার্কেট প্লেস, তেল পরিশোধন কেন্দ্র ও পেট্রল স্টেশনে হামলা শুরু করে। ইউক্রেনের সেই আক্রমণে শতাধিক রুশ ট্যাঙ্কার ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তাদের আক্রমণে রাশিয়া তার জিডিপির প্রায় ১% হারায় বলে ভ্লাদিমির পুতিন ভালদাই ক্লাব আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে উল্লেখ করেন। শেষ পর্যন্ত রাশিয়া সিদ্ধান্ত নেয় এনাফ ইজ এনাফ। এরপর শুরু হয় ইউক্রেনের সেই সমস্ত স্থাপনায় আক্রমণ যা যুদ্ধে কোন না কোন ভাবে সাহায্য করতে পারে বা করে। ইউক্রেনের জন্য ব্ল্যাক সী প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। কিয়েভের দুই তীর হয় পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। আক্রমণ এখনও চলছে। আর সেটা থামার কোন লক্ষণ নেই। বসবাস দিন দিন অসহনীয় হয়ে ওঠায় সাধারণ মানুষ কিয়েভ ত্যাগ করছে। এমনকি বিভিন্ন দেশের দূতাবাস লভভ, এমনকি পোল্যান্ডে সরিয়ে নেবার কথা ভাবছে। জেলেন্সকি প্রশ্ন করছে পুতিন কেন কিয়েভের সেতু আক্রমণ করছে। কেন সে ক্রিমিয়ার সেতু আক্রমণ করেছিল অথবা কেন সে রাশিয়ার বেসামরিক স্থাপনার উপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে এই প্রশ্ন সে নিজেকে করছে না। সেই সময় ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট স্টুব গর্ব করে বলেছিলেন, সাবাস ইউক্রেন। ওয়াইল্ড বেরিস আক্রমণের ফলে জনগণ টের পাবে যুদ্ধের ফল। কিন্তু রাশিয়া পাল্টা আক্রমণ করলেই স্টুবের কাছে তা হয় বর্বরোচিত আক্রমণ। ফ্রান্সে ৬ হাজার ছাত্রছাত্রী আটক। এটা গণতন্ত্র। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের কোন দেশে যেখানে পশ্চিমাদের পছন্দের সরকার ক্ষমতায় নেই – সেখানে আন্দোলন দমাতে ধরপাকড় হলে সেটা স্বৈরাচার। আসলে এমনকি পারমাণবিক বোমা ততটা ক্ষতি করেনি যতটা করছে তথাকথিত পশ্চিমা সভ্য বিশ্বের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড। আইনের দেবীর চোখ কি এমনিতেই কাপড় দিয়ে বাঁধা? কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বের শাসক শ্রেণী অনেক আগেই শুধু চোখের নয় শরীরের সব কাপড় সরিয়ে নিয়েছে বলে লাজ্জা শরম বলতে আর কিছু অনুভব করে না। আর তাই দেখে দেখে ঠিক করে কে দোষী আর কে দোষী নয়। ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধকে যারা এই দুই দেশের যুদ্ধ বলে মনে করে তারা আসলে পর্দার আড়ালে চলমান খেলাটা মিস করে, হয় ইচ্ছাকৃত ভাবে অথবা পশ্চিমা প্রোপাগান্ডার কারণে। তবে কারণ যাই হোক তাতে করে সত্য মিথ্যা হয়ে যায় না। আসলে প্রতিটি ঘটনাই একেকটি অবজেক্টিভ রিয়ালিটি। ইন্টারপ্রিটেশনের উপর নির্ভর করে তা বিভিন্ন ব্যাখ্যা পেতে পারে, ঘটনার রঙ বদলাতে পারে, পক্ষে বা বিপক্ষে বিভিন্ন রকমের জনমত গড়ে উঠতে পারে, কিন্তু তাই বলে ঘটনা তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব হারায় না। পশ্চিমা ন্যারেটিভ দেশে সবাই জানে। ভিন্ন ন্যারেটিভ জানার জন্য তাই আমাদের একটু পেছন দিকে ফিরে যেতে হবে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনের সময় ১৫ টি রিপাবলিকের মধ্যে সবচেয়ে উন্নত ছিল ইউক্রেন। ইউক্রেনে অবস্থিত রুশ প্রধান অঞ্চলগুলো যেমন খারকভ, ওদেসা, দানিয়েৎস্ক, দ্নেপ্রোপেত্রভস্ক- এসব এলাকা ছিল শিল্পোন্নত। এই পুঁজি নিয়ে নিজেদের শিল্পোন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলার সমস্ত পূর্বশর্ত ইউক্রেনের ছিল। কিন্তু ইউক্রেনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তা না করে রাশিয়া ও ইউরোপ দুই দিক থেকেই সুবিধা নেবার চেষ্টা করে। আর দুই চেয়ারে বসার এই সুবিধাবাদী অপরাজনীতি দেশের মানুষকে যেমনি দুই ভাগে বিভক্ত করে, তেমনি দেশের অর্থনীতি করে তোলে পরনির্ভরশীল। ২০১৪ সালের আগে পর্যন্ত ইউক্রেন সুলভ মূল্যে তেল গ্যাস আর ট্র্যানজিট আয় বাবদ বিশাল সুবিধা পেত রাশিয়ার কাছ থেকে, আর বর্তমানে তাদের দেশের বাজেটের মূল খাত বিদেশী ঋণ।
২০১৪ সালের ময়দানের আগে ইনুকোভিচ এক বিলিয়ন ডলারের ঋণের আবেদন করলে ইউরোপ বিভিন্ন অজুহাতে সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে। তখন রাশিয়া তিন বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়ে ইউক্রেনকে সাহায্য করে। সে সময় ইউক্রেনের শিল্প উৎপাদনের মূল ক্রেতা ছিল রাশিয়া। ইউরোপ কখনোই ইউক্রেনের শিল্প জাত পণ্য কেনেনি, বরং সেটা তাদের মার্কেটে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাধা সৃষ্টি করেছে। তাই ইউক্রেনের উন্নয়ন বা ইউক্রেনের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে ইউরোপ কখনোই কাজ করেনি, বরং তার শিল্প ধ্বংস করে, রুশ ও ইউক্রেনিয়ানদের মধ্য জাতিগত বিদ্বেষ তৈরি করে তারা ইউক্রেনকে এন্টি রুশ হিসেবে গড়ে তোলে ১৯৯১ সাল থেকেই। নব্বইয়ের দশকে রাশিয়ার বন্ধু হিসেবে এসে তারা এদেশের শিল্পও ধ্বংস করেছিল। আমরা বাংলার মানুষরা তো ভালোভাবেই জানি ইংরেজরা মসলিন শিল্প ধ্বংস করে কীভাবে ভারতকে বৃটেনের পণ্যের বাজারে পরিণত করে। ইউক্রেনের সামনে ইউরোপিয়া ইউনিয়নের মুলা ছিল আসলে ইউক্রেনকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে দাড় করানো এবং সময় সুযোগে যুদ্ধে নামিয়ে রাশিয়াকে দুর্বল করা। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গনের পরে তারা বিভিন্ন ভাবে রাশিয়াকে কয়েক খণ্ডে ভাগ করার চেষ্টা করে। উরাল সহ কয়েকটি জায়গায় নিজস্ব মুদ্রা চালু করার পরিকল্পনা গৃহীত হয়। চেচনিয়ার যুদ্ধ ছিল সেই প্রকল্পের অংশ। আফগানিস্তানে আল কায়েদা ও তালিবানের মতই ইসলামিক খেলাফতের মাধ্যমে রাশিয়ার দক্ষিণ অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। কিন্তু সেখানে সফল না হয়ে প্রথমে জর্জিয়া আর পরে ইউক্রেনের মাধ্যমে নিজেদের দীর্ঘ দিনের আশা পূরণে মাঠে নামে তারা। তাই এই যুদ্ধ ইউক্রেনের জনগণের যুদ্ধ নয়, এই যুদ্ধ পশ্চিমা বিশ্বের যুদ্ধ যেখানে ইউক্রেনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ভাড়াটে গুণ্ডা সর্দার আর জনগণ অধিকারহীন সেনা যারা ইচ্ছা অনিচ্ছায় যুদ্ধ করতে বাধ্য। সেখানে প্রতিদিন সাধারণ মানুষদের জোর করে ধরে ধরে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্বের চাপে যুদ্ধে যাবার বয়স কমানো হয়েছে, এমনকি মেয়েদের সেনাবাহিনীতে ডাকার কথা চলছে। যুদ্ধ বন্দীদের দেখলে বোঝা যায় এরা যুদ্ধ করার জন্য মোটেই প্রস্তুত নয়, এদের যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে মরার জন্য। তাহলে কি ইচ্ছে করে ইউক্রেনে জেনোসাইড চালানো হচ্ছে? কার স্বার্থে? ইউক্রেনের মানুষের স্বার্থে নয় অবশ্যই।
প্রশ্ন হচ্ছে এই অবস্থা কতদিন চলবে? রাশিয়া দিন দিন আক্রমণের চাপ বাড়াচ্ছে। কিন্তু জেলেনস্কি শান্তি চুক্তির কথা না বলে আগামী তিন মাসে রাশিয়া ধ্বংসের হুমকি দিয়েছে। এটা করছে ন্যাটো ও ইউরোপের নেতারা কিয়েভ ভ্রমণের পরে। ইউরোপ কিছুতেই ইউক্রেনকে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে দেবে না। রাশিয়াও কোন রকম যুদ্ধ বিরতিতে রাজী নয়, তাদের প্রয়োজন দীর্ঘ মেয়াদী শান্তি। ইউরোপের ধারণা রাশিয়াকে যুদ্ধে ব্যস্ত রেখে তারা নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার পূর্ণ করবে আর তারপর সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রথমে কালিনিনগ্রাদ ও পরে রাশিয়া আক্রমণ করবে। ইউরোপের নেতারা শুধু বলছেই না, লক্ষ্য অর্জনে নিজেদের অর্থনীতির সামরিকীকরণ শুরু হয়েছে। রাশিয়া বলেছে যদি তেমন হয়, মানে ইউরোপ বা ন্যাটো যদি কালিনিনগ্রাদ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে তবে সে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে এর উত্তর দেবে আর সেই যুদ্ধ হবে ক্ষণস্থায়ী। তারা জানে জনবল ও অর্থনৈতিক দিকে তারা ইউরোপের সাথে পেরে উঠবে না, তবে পারমাণবিক অস্ত্র তাদের এডভান্টেজ দেয়। তাই প্রয়োজনে সেটা ব্যবহার করতে তারা দ্বিধা বোধ করবে না। ইতিমধ্যে আমেরিকা নিজেকে ইউক্রেন সমস্যা থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। মারকো রুবি বলেছেন বর্তমান অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক – এরপর হয় শান্তি চুক্তি হবে না হয় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে। সব মিলিয়ে ইউক্রেন ফ্রন্টে সব অনিশ্চিত যা আসলে নিশ্চিত ধ্বংসের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে ইউরোপকে। আর যদি ভাগ্য খারাপ হয় সেটা সমস্ত মানব সভ্যতার জন্য হতে পারে মহাপ্রলয়।
গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো