সীতাকুণ্ডে পার্লাইট ছড়িয়ে পড়ায় বাড়ছে উদ্বেগ: পরিবেশ, শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও জননিরাপত্তা নিয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি -ফজলুল কবির মিন্টু

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের শিপ রিসাইক্লিং শিল্পাঞ্চলে সম্প্রতি ভাঙার জন্য আনা কয়েকটি LNG/LPG গ্যাসবাহী জাহাজ থেকে অপসারিত পার্লাইট (Expanded Perlite) যত্রতত্র ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগে স্থানীয় বাসিন্দা, শ্রমিক এবং পরিবেশ সচেতন মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এলাকাবাসীর দাবি, জাহাজ ভাঙার সময় এবং পরবর্তীতে এই সাদা পাউডার বাতাসে উড়ে আশপাশের বসতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক, কৃষিজমি ও খোলা স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং জাহাজভাঙা শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
শিপ রিসাইক্লিং শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও এই শিল্পের টেকসই বিকাশ নিশ্চিত করতে হলে শ্রমিকের নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সুরক্ষাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শিল্পের উন্নয়ন কখনোই শ্রমিকের জীবন, স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্য কিংবা পরিবেশের বিনিময়ে হতে পারে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জাহাজ কাটার সময় যখন বড় বড় ধাতব পর্দা, ইনসুলেশন স্তর বা তাপ নিরোধক কাঠামো অপসারণ করা হয়, তখন বিপুল পরিমাণ পার্লাইট বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে ধুলা নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা, যেমন পানি ছিটানো, নির্ধারিত সংগ্রহ ব্যবস্থা বা বদ্ধ পরিবহন নিশ্চিত করা হয় না। ফলে বাতাসের মাধ্যমে এই সূক্ষ্ম কণাগুলো আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড নিজেদের দায় এড়াতে অপসারিত পার্লাইট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে দিয়ে দেয়। পরে এসব উপাদান বিভিন্ন কাজে ব্যবহার বা পরিবহনের সময় আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। যদিও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য এখনো জানা যায়নি, তবে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।
সম্প্রতি সীতাকুণ্ডের জোড়ামতল এলাকায় একটি ছাগলের মৃত্যুর ঘটনাও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এলাকাবাসীর একাংশের ধারণা, পার্লাইট মিশ্রিত ঘাস খাওয়ার কারণে প্রাণীটির মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে এ দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো পশু চিকিৎসা প্রতিবেদন, ময়নাতদন্ত বা পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়নি। তাই এ বিষয়ে অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত নয়, বরং বৈজ্ঞানিক তদন্তই হওয়া উচিত একমাত্র পথ। প্রাণীটির নমুনা, আশপাশের ঘাস, মাটি এবং সংশ্লিষ্ট পার্লাইট পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হলে প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা সম্ভব হবে।
বৈজ্ঞানিকভাবে পার্লাইট একটি আগ্নেয় শিলা থেকে তৈরি তাপ নিরোধক খনিজ। এটি উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল, রাসায়নিকভাবে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় এবং সাধারণ অবস্থায় দাহ্য নয়। এ কারণে LNG/LPG জাহাজের কার্গো ট্যাংকে তাপ নিরোধক হিসেবে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তবে এটি সহজে পচনশীল নয় এবং দীর্ঘদিন খোলা পরিবেশে পড়ে থাকলে ধুলার আকারে বারবার বাতাসে উড়তে পারে।
বিশুদ্ধ পার্লাইটকে সাধারণভাবে উচ্চমাত্রার বিষাক্ত পদার্থ হিসেবে বিবেচনা করা না হলেও এর সূক্ষ্ম ধুলিকণা দীর্ঘ সময় শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে নাক, গলা ও শ্বাসনালীতে জ্বালাপোড়া, কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং চোখে অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে যাদের হাঁপানি, সিওপিডি বা অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। জাহাজভাঙা শ্রমিকরা প্রতিদিন দীর্ঘ সময় এই পরিবেশে কাজ করেন। ফলে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE), উপযুক্ত রেসপিরেটর, ধুলা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত না হলে তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জাহাজ থেকে অপসারিত পার্লাইট সবসময় বিশুদ্ধ অবস্থায় থাকে—এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বহু বছর জাহাজের অভ্যন্তরে ব্যবহারের ফলে এর সঙ্গে তেল, হাইড্রোকার্বন, মরিচা, ভারী ধাতুর কণা, রং, রাসায়নিক পদার্থ বা অন্যান্য দূষক মিশে যেতে পারে। তাই পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ ছাড়া এসব পার্লাইটকে নিরাপদ ঘোষণা করা বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়।
বাংলাদেশ ২০২৫ সালের ২৬ জুন থেকে কার্যকর হওয়া Hong Kong International Convention বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। এই কনভেনশন অনুযায়ী জাহাজ পুনঃ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান নিরাপদভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং পরিবেশসম্মতভাবে নিষ্পত্তি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একইভাবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর Safety and Health in Shipbreaking Guidelines এবং Basel Convention-ও শ্রমিকের স্বাস্থ্য, পরিবেশ সুরক্ষা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে।
বাংলাদেশের শ্রম আইন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার নীতিমালাও নিয়োগকর্তার ওপর একটি নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব অর্পণ করেছে। শ্রমিকদের এমন কোনো পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করা যায় না, যেখানে যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়নি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—যদি পার্লাইট ক্ষতিকর না-ই হয়, তবে কেন এটি খোলা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে? আর যদি এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ হয়, তবে কেন যথাযথভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রিতভাবে অপসারণ করা হচ্ছে না? এই প্রশ্নগুলোর জবাব দেওয়ার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং শিল্পমালিকদেরই।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন—
- ছড়িয়ে পড়া পার্লাইটের নমুনা সংগ্রহ করে স্বীকৃত পরীক্ষাগারে রাসায়নিক বিশ্লেষণ করা।
- আশপাশের বায়ু, মাটি, ঘাস ও পানির নমুনা পরীক্ষা করা।
- জোড়ামতলে মারা যাওয়া ছাগলের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে পূর্ণাঙ্গ ভেটেরিনারি তদন্ত পরিচালনা করা।
- শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে পার্লাইট অপসারণ, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য বাধ্যতামূলক মানদণ্ড প্রণয়ন ও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা।
- শ্রমিকদের জন্য উন্নতমানের রেসপিরেটর, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা।
- সংশ্লিষ্ট এলাকায় পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ (Environmental Monitoring) নিয়মিত পরিচালনা করে তার ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা।
- স্থানীয় জনগণ, শ্রমিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা।
শিল্পের উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু উন্নয়নের অর্থ পরিবেশ দূষণ, শ্রমিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি কিংবা স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করা নয়। একটি দায়িত্বশীল শিপ রিসাইক্লিং শিল্প গড়ে তুলতে হলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বাস্তবায়নের পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং বৈজ্ঞানিক তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বিষয়টি আর অবহেলার সুযোগ নেই। পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE), জেলা প্রশাসন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে অবিলম্বে একটি যৌথ তদন্ত পরিচালনা করা উচিত।
পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানই নির্ধারণ করবে সীতাকুণ্ডে ছড়িয়ে পড়া পার্লাইট পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার অপেক্ষায় নিষ্ক্রিয় থাকার সুযোগ নেই। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, অনিয়ন্ত্রিতভাবে পার্লাইট ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করা এবং শ্রমিক ও স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
লেখক:
ফজলুল কবির মিন্টু
সদস্য সচিব, জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরাম
এবং
কোঅর্ডিনেটর, জাহাজভাঙা শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক তথ্য কেন্দ্র।
