মতামত

প্রগতিশীল নারী আন্দোলনের অগ্রদূত বেগম উমরতুল ফজল

-লতিফা কবির

বিশিষ্ট লেখিকা, নারী অধিকার আন্দোলনের নেত্রী ও সমাজ সংস্কারক বেগম উমরতুল ফজল-এর ২১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাঁকে স্মরণ করছি। নারী সমাজের মুক্তি, শিক্ষা, অধিকার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন তৎকালীন যুগের এক অসাধারণ প্রগতিশীল মুসলিম নারী। তাঁর অক্লান্ত শ্রম, সাংগঠনিক দক্ষতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি চট্টগ্রামসহ সমগ্র দেশের নারী আন্দোলনকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল।

১৯২১ সালে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার অন্তর্গত ফতেয়াবাদ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ও সংস্কৃতিমনা পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা ছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক মাহবুবুল আলম এবং মাতা জুলেখা খাতুন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুব বেশি না হলেও তিনি ডা. খাস্তগীর গার্লস হাই স্কুলে অধ্যয়ন করেন। ১৯৩৯ সালে তিনি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক আবুল ফজল-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সংসার জীবনে তিনি ছিলেন পাঁচ পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জননী। তাঁর সন্তানদের মধ্যে সাংবাদিক আবুল মোমেন এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের অধ্যাপক আবুল মনসুর সুপরিচিত।

অধ্যাপক আবুল মনসুরের একজন ছাত্রী হিসেবে তাঁকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। তাঁর মৃদুভাষী আচরণ, আন্তরিকতা ও গভীর মননশীলতা আজও স্মৃতিতে অম্লান। ফাইন আর্টস ভবনের চারতলায় তাঁর ক্লাস করতে দৌড়ে যাওয়া, ক্লাসে সবার আগে বসার চেষ্টা—এসব স্মৃতি আজ বেগম উমরতুল ফজলকে স্মরণ করতে গিয়ে আরও বেশি মনে পড়ে। তখন জানা ছিল না, তিনি এমন একজন মহীয়সী নারীর সন্তান।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ-এর চট্টগ্রাম জেলা শাখার প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী ছিলেন বেগম উমরতুল ফজল। ১৯৭০ সালের ৪ এপ্রিল মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমৃত্যু তিনি সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভাষা আন্দোলন, ষাটের দশকের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পর দেশের প্রায় প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনে তাঁর দৃঢ় উপস্থিতি ছিল।

যে সময়ে মুসলিম পরিবারের নারীদের অন্দরমহল পেরিয়ে সমাজে সক্রিয় হওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন, সেই সময় তিনি অবহেলিত নারী সমাজকে সংগঠিত করেছেন, সমাজসেবা করেছেন এবং নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ সংস্কারমুক্ত ও কুসংস্কারবিরোধী একজন মানুষ। সংস্কৃতিমনা পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে সমাজের গোঁড়ামি তাঁকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি।

বেগম উমরতুল ফজল ছিলেন একজন শক্তিশালী লেখকও। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে — “স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিন”, “মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের নারী”, “উর্মি”, “এক নদী দুই তীর”, “দাদীমার গল্পের ঝুলি”, “সুরভুন্নেসার প্রেম”, “পূর্ববঙ্গের গল্প কাহিনী” প্রভৃতি। এছাড়া বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁর অসংখ্য কবিতা, নিবন্ধ ও স্মৃতিকথা প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্যচর্চা, সংগঠন ও সমাজসেবার পাশাপাশি তিনি সংসার, সন্তান ও পরিবারের প্রতিও দায়িত্বশীল ছিলেন।

সংগঠনের কর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন প্রিয় “খালাম্মা”—একজন অভিভাবক, সাহসদাত্রী ও অনুপ্রেরণার উৎস। বয়স ও শারীরিক অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে তিনি সংগঠনের কাজে গ্রাম থেকে শহর, এমনকি ঢাকাতেও ছুটে গেছেন। হাঁটতে কষ্ট হলেও রিকশা কিংবা গরুর গাড়িতে করেও মিছিলের অগ্রভাগে থেকেছেন। তাঁর এই সাহস, দায়বদ্ধতা ও সংগ্রামী চেতনা আজও নারী আন্দোলনের কর্মীদের অনুপ্রাণিত করে।

একটি বিশ্ব নারী দিবসের আলোচনা সভায় তাঁর বক্তব্যের একটি অংশ আজও স্মৃতিতে গেঁথে আছে। তিনি বলেছিলেন, নারী দিবস এমন এক দিন হওয়া উচিত, যেদিন নারীরা ঘরের বাইরে বের হয়ে নিজেদের আনন্দ, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা উদযাপন করবে এবং পুরুষরা সংসারের দায়িত্ব পালন করবে। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি নারী-পুরুষের সমঅধিকার ও সমদায়িত্বের বিষয়টি অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছিলেন।

পঁচাত্তরের রাজনৈতিক অন্ধকার সময়ে তিনি ছিলেন সাহসী আলোর শিখা। তরুণ লেখক, সংস্কৃতিকর্মী ও নারী আন্দোলনের কর্মীরা তাঁর কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। সমাজ ও রাষ্ট্রের অবহেলিত মানুষের প্রতি তাঁর গভীর সহমর্মিতা ছিল। জীবনের শেষ পর্যায়ে বার্ধক্যজনিত জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ১৫ মে ২০০৫ সালে ৮৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর আদর্শ, সংগ্রাম ও মানবিক চেতনা আজও আমাদের মাঝে জীবন্ত।

তিনি বিশ্বাস করতেন—

“নারীর শিক্ষা সমাজের ভিত্তি শক্ত করে। যেখানে নারী শিক্ষিত, সেখানে সমাজ উন্নত।”

এবং—

“নারীর ক্ষমতায়ন সমাজকে সমৃদ্ধ করে। নারীর উন্নয়নই জাতির উন্নয়ন। একজন নারী সমাজে বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে।”

নারী শিক্ষাকে তিনি সমাজের মেরুদণ্ড মনে করতেন। আজও তাঁর আদর্শ, নীতি ও সংগ্রামী জীবন নারী নেতৃত্ব, মানবিক সমাজ গঠন এবং প্রগতিশীল আন্দোলনের প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।

এই মহীয়সী নারীকে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি। তাঁর স্মৃতি চিরভাস্বর হয়ে থাকুক আগামী প্রজন্মের হৃদয়ে।
(লেখক: সভানেত্রী, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, চট্টগ্রাম জেলা কমিটি।)