বিজন ভাবনা

বিজন ভাবনা (৪০): আওয়ামী লীগ   

-বিজন সাহা

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হল। এতে কার কি লাভ হল জানি না তবে বাংলাদেশের রাজনীতির যে ক্ষতি হল তাতে সন্দেহ নেই। কোন দল রাজনীতি করবে কি করবে না সেটা জনগণের হাতে ছেড়ে দেয়াই রাজনীতির নিয়ম। আমরা যে স্বৈরাচারের কথা বলছি – দেশের কোন দল সেই দোষে দোষী নয়, বিশেষ করে যারা ক্ষমতায় ছিল? এমনকি যারা ক্ষমতা থেকে বহু দূরে সেসব দলেও ভেতরেও নেতাদের স্বৈরাচারী মনোভাব হরহামেশাই দেখা যায়। এই নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশে সুস্থ রাজনীতির পথ আপাতত বন্ধ করে দিল। অথচ মানুষ ভেবেছিল নির্বাচিত সরকার এলে সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশের সব সমস্যা, তা সে দুর্নীতি হোক আর ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা  হোক, সব কিছুর মূলে রয়েছে অসুস্থ রাজনীতি। রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতার হস্তান্তরে বিশ্বাস করে না বলেই তারা প্রতিনিয়ত এমনকি দেশদ্রোহী শক্তির সাথে আঁতাত করে, অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে শত্রু হিসেবে দেখে। আর এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন মৌলবাদী শক্তি যারা গণতন্ত্র তো দূরের কথা, এমনকি দেশের সংবিধানে পর্যন্ত বিশ্বাস করে না, দিব্যি দেশের এমপি হয়, মন্ত্রী হয়।

কয়েক দিন আগে এসব নিয়েই কথা হচ্ছিল এক বন্ধুর সাথে। কথা প্রসঙ্গে ও জিজ্ঞেস করল আওয়ামী লীগ কেন তাদের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করে না? তারা কি কোন ভুলই করেনি? ভুল না করলে সবাই পালিয়ে গেল কেন? এরশাদের বিরুদ্ধে এত আন্দোলন হল, কই তারা তো পালিয়ে গেল না?
অবশ্যই করেছে। অনেক ভুল করেছে। কিন্তু আমার ধারণা ভুল স্বীকার না করার মূলে রয়েছে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি। প্রথমত এরশাদের সময় প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার রাজনীতি শুরু হয়নি। ঐ সময় রাজনৈতিক দলগুলো দিব্যি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনের বাইরে রাখা তো দূরের কথা, তাদের প্রচারে তেমন বাধা দেয়া হয়নি। বলব না যে তখন রাজনীতি সুস্থ ছিল, কিন্তু সেটা আজকের মত মুমূর্ষু অবস্থায় ছিল না। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হত্যা করেনি, করেছে সেনা বাহিনীর একটি অংশ। একই কথা সত্য জিয়াউর রহমানের ক্ষেত্রে। তাই এরশাদের জেলে যাবার ভয় থাকলেও রাজনৈতিক পতিপক্ষের হাতে খুন হবার ভয় ছিল না। কিন্তু ২১ আগস্টের পর থেকে দেশে রাজনৈতিক নেতাদের শারীরিক ভাবে ধ্বংস হয়ে যাবার সংস্কৃতি চালু হয়েছে। হয়ত বা এটাই আওয়ামী লীগের নেতাদের দেশত্যাগে বাধ্য করেছে। তাছাড়া আগে রাজনীতি করত রাজনৈতিক নেতারা। তাদের পুঁজি ছিল দেশের মানুষ, মানুষের ভোট। এখন, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সাংসদদের ও নেতাদের বেশীর ভাগ ছিল ব্যবসায়ী, যেটা পত্রপত্রিকায় লেখা হয়েছে। তাদের ধনদৌলত বেশীর ভাগ দেশের বাইরে। এটাও নেতাদের দেশত্যাগে উৎসাহিত করেছে। কেন তারা অনুশোচনা করে না সেটাই প্রশ্ন। যদি খেয়াল করি তাহলে দেখব তাদের অনেক কথাই যা তখন আমরা বিশ্বাস করিনি সত্য ছিল। তারা এই আন্দোলনের পেছনে জামায়াত শিবিরের হাত থাকার কথা বলেছে। আমরা সেটা ভুল মনে করেছি। মনে করেছি এটা তাদের রাজনৈতিক চাল। এখন এটা প্রমানিত সত্য। এটা হয়ত তাদের অনুশোচনা করা থেকে বিরত রাখছে। তারা ভাবছে তারা তো ঠিক ছিল, তাহলে অনুশোচনা করবে কেন। কিন্তু এতে করে তো আর তাদের সব পাপ স্খলন হয় না। একথা সত্য যে আন্দোলনে যত মানুষ মারা গেছে তার একটি বড় অংশ মারা গেছে আন্দোলনকারীদের হাতে। সেখানে পুলিশ যেমন ছিল, তেমনি ছিল তাদের নিজেদের লোকজন যাদের লাশ দেখিয়ে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি আদায় করা হয়েছে। আর সেকথা যেমন ব্যবহৃত বুলেটে প্রমাণিত হয়েছে, তেমনি প্রমাণিত হয়েছে তাদের নিজেদের বয়ানে, বিশেষ করে ডঃ ইউনুসের মেটিকুলাস ডিজাইনের বয়ান থেকে। সেই অর্থে সরকারের হাত রক্তাক্ত হলেও সব মৃত্যুর দায় হয়ত তাদের নেই। এক্ষেত্রে ভালো হত যদি দলীয় নেতৃত্ব সেই দায় স্বীকার করে জনগণের কাছে ক্ষমা চাইত। সেই সংস্কৃতি তো দেশে নেই। এমনকি জামায়াতও একাত্তরের গণহত্যার দায় স্বীকার করে ক্ষমা চায়নি। তবে সংস্কৃতির বাইরেও মনে হয় টেকনিক্যাল সমস্যা আছে। যদি আওয়ামী নেতৃত্ব দেশে থাকত তাহলে এটা করা তাদের পক্ষে সহজ হত। এখন ক্ষমা চেয়ে সেসব হত্যার দায় কাঁধে নিলেই যেসব দেশে তারা অবস্থান করছে সেসব দেশের সরকারের পক্ষে তাদের আশ্রয় দেয়া কঠিন হবে। আমার ধারণা এসব বিবেচনা থেকেই তারা এই মুহূর্তে ইচ্ছে থাকলেও অনুশোচনা করতে পারছে না। দেশে যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হত, তারা হয়ত দেশে ফেরার কথা ভাবতে পারত, দেশে ফিরে আইনি পথে নিজেদের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করত। কিন্তু সাবেক স্পিকারের উপর আদালতে আক্রমণ প্রমাণ করে যে দেশে তারা এখনও নিরাপদ নয়। যদিও পরবর্তীতে তিনি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন এবং অনেকেই এর মধ্যে ষড়যন্ত্র খোঁজার চেষ্টা করছে। তবে সব মিলে আওয়ামী লীগের জন্য রাজনীতি করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

আমরা সাধারণত নিজেদের অবস্থান থেকে সবকিছু বিচার করি। এর পেছনে যেমন নিজেদের সামাজিক, মানসিক, রাজনৈতিক এসব অবস্থান কাজ করে ঠিক তেমনি কাজ করে নিজেদের অন্যদের জায়গায় বসিয়ে তার অবস্থা বোঝার চেষ্টা না করার সংস্কৃতি। এটা মনে হয় আমাদের শর্ট মেমোরির কারণে। আর এ কারণেই আমরা বার বার আপদ আর বিপদের মধ্য থেকে শাসক বেছে নেই। জনগণ ক্ষমতাসীন দলের এমনকি ছোট অপরাধের জন্য আগের সরকারের অনেক বড় অপরাধ মাফ করে দিতে রাজী। ফলে সেই দল যখন ক্ষমতায় ফিরে আসে তখন সে তার আগের টার্মের ভুলগুলো সংশোধনের চেষ্টা করে না। তারা ধরেই নেয় যে জনগণ তাদের আবারও ক্ষমা করবে। ফলে নিজেদের শোধরানোর পরিবর্তে তারা উল্টো নিজেদের আরও হিংস্র করে তোলে, ভাবে শুধু মাত্র ডাণ্ডা মেরেই জনগণকে ঠাণ্ডা করা যাবে। তবে এ জন্যে শুধু জনগণই দায়ী নয়। এটা অনেকটা হ্যাঁ না ভোটের মত। আপদ আর বিপদ ছাড়া বেছে নেবার মত কোন পথ তার কাছে নেই। নেই – তা নয়। আছে মহাবিপদ। যারা অপেক্ষাকৃত কন্টকহীন পথ দেখাতে পারত – তারা নিজেরাই পথহারা, দিশেহারা, তারা ছত্রভঙ্গ, তারা নষ্টের হাতে ইউজফুল ইডিয়ট বা উপকারী বোকা।

আওয়ামী শাসনামলে আওয়ামী লীগ নিজে ও তার সমর্থকরা প্রচার করে বেড়াত যে তারা ক্ষমতায় না থাকলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থাকবে না, স্বাধীনতার পক্ষের মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। তারা যে তাদের এই পর্যবেক্ষণে খুব ভুল ছিল না সেটা এখন টের পাচ্ছি। তবে একই সাথে অন্য দিকটাও ভেবে দেখা দরকার। ঐ সময় অনেকের সাথে আমার তর্ক হত আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের অতিরিক্ত আস্থা দেখে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল তখন নিঃশর্ত ভাবে তাকে সমর্থন করার জন্য। আমার ধারণা ছিল এই নিঃশর্ত সমর্থন আওয়ামী লীগকে ভুল মেসেজ দিয়েছে। হিন্দু ভোট সম্পর্কে আওয়ামী লীগের যেমন ধারণা ছিল আমাদের ভোট না দিয়ে ওরা যাবে কোথায়, ঠিক একই ধরণের মনোভাব তৈরি হয় তাদের ক্ষেত্রে যারা আওয়ামী লীগ করে না অথচ স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি বলে নিজেদের মনে করে। আর এ কারণেই আওয়ামী লীগ হেফাজতের মত স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির সাথে আপোষ করলেও স্বাধীনতার পক্ষের এসব শক্তি বা গোষ্ঠীর সাথে আলোচনা পর্যন্ত করেনি, এদের আশা আকাঙ্ক্ষাকে বিন্দুমাত্র মুল্য দেয়নি। ফলে এদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে যেটাকে পুরো মাত্রায় ব্যবহার করেছে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি। অন্যদিকে ২০২৪ এর নির্বাচনে নিজ দলের একাধিক প্রার্থীকে পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দিয়ে দলকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করেছে। দলের পরীক্ষিত সদস্যদের সরিয়ে রেখে অর্থের বিনিময়ে ব্যবসায়ী ও দলীয় আদর্শে বিশ্বাসী নয় এমন অনেককে দলীয় মনোনয়ন দেয়া সাধারণ কর্মীদের ক্ষুব্ধ করেছে। বাম দলগুলো, যারা সত্যিকার অর্থেই দেশে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি চায় তারা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতের শত্রু। তবে সশস্ত্র আন্দোলনের পথে না গেলে এসব দল হতে পারে সেই বন্ধু যে বিনা লাভে ভুল ধরিয়ে দেয়।

আসলে সুস্থ রাজনীতির জন্য নিজেদের স্বার্থেই এখন আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফেরানো উচিৎ। এটা যতটা না আওয়ামী লীগের জন্য তারচেয়ে বেশি করে দরকার সবার জন্য বাসযোগ্য একটি বাংলাদেশের জন্য। আজ যারা বিরোধী দলে তারা রাজনৈতিক শক্তি নয়। তাদের সমস্ত ইতিহাস প্রমাণ করে একবার ক্ষমতায় গেলে তারা এমন এক বাংলাদেশ সৃষ্টি করবে যা এদেশের প্রকৃতি, এদেশের ইতিহাস, এদেশের মাটি ও মানুষের পরিপন্থী। ইরান, আফগানিস্তান এসব দেশেও কেউ ভাবেনি যে একদিন তাদের এরকম শাসকের খপ্পরে পড়তে হবে। মৌলবাদের উত্থান হয় অসুস্থ পরিবেশে। এখনও সময় আছে দেশকে নর্মাল ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনার। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থা সেই বুড়া বুড়ির মত যারা জেগে জেগে দেখবে চোর সব নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আগে কথা বলবে না বলে চোরকে বাধা দেবে না। এখনই সময় শুরু করার। বিএনপির সামনে সুযোগ আছে সেই মহানুভবতাটুকু দেখানোর।

গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো