চলমান সংবাদ

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সংঘাত চতুর্থ দিনে: বিশ্বশক্তিগুলোর কড়া প্রতিক্রিয়া

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ টানা চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে। গত তিন দিনের পাল্টাপাল্টি হামলায় উভয়পক্ষের বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন। তবে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ইরানেই বেশি বলে জানা যাচ্ছে।

ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, সংঘাত শুরুর পর থেকে দেশটিতে সাড়ে পাঁচশ’র বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ প্রায় চার ডজন শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

অন্যদিকে, সোমবার পর্যন্ত অভিযানে অংশ নিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চারজন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। আরও কয়েকজন সেনা গুরুতর আহত হয়েছেন। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশটির নয়জন নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।

খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের নতুন নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে আগ্রহী—এমন দাবি ওয়াশিংটন করলেও তা সরাসরি নাকচ করেছেন ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলী লারিজানি। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় যাবে না তেহরান।

এদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা দিয়েছেন, তেহরানের ওপর হামলার মাত্রা আরও বাড়ানো হবে। ফলে সংঘাত দ্রুত থামার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।


জাতিসংঘের উদ্বেগ

চলমান সংঘাতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এই সংঘাত থামানো না গেলে তা বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার টুর্কও সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যেকোনো সশস্ত্র সংঘাতে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


বিশ্বশক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাজ্য

যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, তারা ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সরাসরি জড়িত নয়। দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার বলেছেন, যুক্তরাজ্য এই হামলায় যোগ দেবে না।

তবে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি বলেছেন, ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত ব্রিটিশ সেনা ও নাগরিকরা ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।


চীন

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এ ধরনের সামরিক অভিযান ইরানের সার্বভৌমত্বের গুরুতর লঙ্ঘন এবং জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থী।

সব পক্ষকে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং।


রাশিয়া

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন খামেনির হত্যাকাণ্ডে শোক প্রকাশ করেছেন এবং এটিকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছেন। মস্কো সতর্ক করেছে, এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি পেরিয়ে আরও বিস্তৃত হতে পারে।


জার্মানি

জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ইরানের পাল্টা হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জার্মান সূত্র জানিয়েছে, আঞ্চলিক দেশগুলোতে ইরানের হামলা বন্ধ না হলে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের অভিযানে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে বার্লিন।


ফ্রান্স

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁ আগেই সতর্ক করেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা সবার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তবে ফ্রান্স সরকারের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, খামেনির মৃত্যুকে তারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত রয়েছেন।


অন্যান্য প্রতিক্রিয়া

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কালাস বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘বিপজ্জনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। কূটনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে ইইউ।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি উত্তেজনা কমাতে মিত্র ও আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ বলেছেন, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে—সে লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে তারা সমর্থন করেন


বাড়ছে অনিশ্চয়তা

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের হামলা জোরদার করার ঘোষণা এবং ইরানের কঠোর অবস্থানের কারণে সংঘাত দ্রুত থামার সম্ভাবনা কম। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানালেও পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বিশ্ব রাজনীতি, জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।