মতামত

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল: ‘মধু’ শেষ হলে কী থাকবে দেশের হাতে?

– ফজলুল্কবির মিন্টু

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। আর এই বন্দরের সবচেয়ে আধুনিক, লাভজনক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হলো নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। এমন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও লাভজনক টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ শুধু প্রশ্নবিদ্ধই নয়, বরং জাতীয় স্বার্থের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ।

১. বিনিয়োগ ছাড়াই লাভের ‘মধুচক্র’

ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটিতে বড় কোনো নতুন বিনিয়োগ করতে চাচ্ছে না। বরং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অর্থে কেনা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি—যার বেশির ভাগই গত পাঁচ বছরে সংগ্রহ করা—সেগুলোর পূর্ণ কর্মক্ষমতা ব্যবহার করেই পরিচালনা শেষ করতে চায় তারা। অর্থাৎ যতদিন যন্ত্রপাতিতে ‘মধু’ আছে, ততদিনই এনসিটিতে থাকার আগ্রহ। এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অংশীদারিত্ব নয়, বরং এক ধরনের লাভ-নির্ভর সুযোগসন্ধানী চুক্তি

২. লাভজনক টার্মিনাল, অথচ বিদেশি অপারেটর!

এনসিটির আয় ও নিট মুনাফা ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ পাঁচ অর্থবছরে এনসিটি থেকে নিট মুনাফা হয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। এমন একটি লাভজনক টার্মিনাল দক্ষতার অভাব বা লোকসানের কারণে নয়, বরং সম্পূর্ণ সচল ও সক্ষম অবস্থাতেই বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত—এর যৌক্তিকতা কোথায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব ক্ষেত্রে বিদেশি অপারেটর প্রয়োজন, সেগুলো হলো ‘গ্রিনফিল্ড’ প্রকল্প—যেখানে অবকাঠামো নেই, বিনিয়োগ দরকার। কিন্তু এনসিটি তার বিপরীত উদাহরণ।

৩. রাজস্ব ক্ষতির ঝুঁকি

বর্তমান ট্যারিফ কাঠামো অনুযায়ী, প্রতি ২০ ফুট কনটেইনারে বন্দর কর্তৃপক্ষের নিট আয় প্রায় ১০০ ডলার। অথচ ডিপি ওয়ার্ল্ড শুরুতে অপারেটর ফি হিসেবে মাত্র ৬৫ ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। এটি স্পষ্টতই দেশের রাজস্ব স্বার্থের পরিপন্থী। দরকষাকষির পরিমাণ যতই বাড়ুক না কেন, মধ্যস্বত্বভোগী অপারেটর যুক্ত হলে বন্দরের আয় কমবেই—এটাই বাস্তবতা।

৪. দীর্ঘমেয়াদে দক্ষতা ও সক্ষমতা হারানোর শঙ্কা

ডিপি ওয়ার্ল্ড যদি ৩০–৪০ বছর এনসিটি পরিচালনা করে, তাহলে এই দীর্ঘ সময়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সুযোগ হারাবে। একসময় টার্মিনাল ফিরে পেলেও তখন প্রয়োজন হবে নতুন করে বিপুল বিনিয়োগ, নতুন ম্যানেজমেন্ট ও প্রশিক্ষণের—যা বন্দরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

৫. জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন

চট্টগ্রাম বন্দর শুধু একটি বাণিজ্যিক স্থাপনা নয়; এটি দেশের আমদানি-রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৌশলগত যোগাযোগের কেন্দ্র। এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পরিচালনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দীর্ঘ সময়ের জন্য তুলে দেওয়া জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও তোলে—যা হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।

৬. শ্রমিক অসন্তোষ ও অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা

ইতোমধ্যে বন্দর শ্রমিক-কর্মচারীরা এই চুক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছেন, শাটডাউন কর্মসূচিও ঘোষণা করেছেন। জোর করে চুক্তি বাস্তবায়ন করলে বন্দরে অচলাবস্থা সৃষ্টি হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতে। অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া কোনোভাবেই শুভ লক্ষণ নয়।

উপসংহার

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল কোনো লোকসানি বা অচল প্রকল্প নয় যে বিদেশি অপারেটরের শরণাপন্ন হতে হবে। এটি একটি লাভজনক, আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ টার্মিনাল—যার পরিচালনা দেশের হাতেই থাকা উচিত। প্রয়োজন হলে দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর বা পরামর্শক নিয়োগের পথ খোলা আছে। কিন্তু ইজারার নামে লাভজনক জাতীয় সম্পদ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থের পরিপন্থী

এনসিটি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও গভীর চিন্তা, স্বচ্ছ আলোচনা ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখাই এখন সময়ের দাবি।

(লেখকঃ সংগঠক, টিইউসি, কেন্দ্রীয় কমিটি)