র্যাব বিলুপ্তির দাবির মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত, উঠছে বৈধতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন
গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দেশে-বিদেশে তীব্র সমালোচিত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্তির সুপারিশ থাকার পরও অন্তর্বর্তী সরকার এই বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে ১৬৩টি নতুন গাড়ি কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এসব যানবাহন কেনার অনুমোদন দেওয়ায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে র্যাবের জন্য ৩টি জিপ, ১০০টি টহল পিকআপ ও ৬০টি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত মাইক্রোবাস কেনার প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদন পায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও জাতীয় নির্বাচনের আগে এসব গাড়ি কেনা সম্ভব নয় বলে দাবি করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তবে সময়ের সীমাবদ্ধতা থাকলেও সিদ্ধান্তটির রাজনৈতিক ও নৈতিক তাৎপর্য নিয়েই মূলত বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
র্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে গঠিত গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন এই বাহিনী বিলুপ্তির সুপারিশ করে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও র্যাবের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে এই বাহিনী বিলুপ্তির দাবি জানিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে র্যাবের জন্য নতুন করে গাড়ি কেনার সিদ্ধান্তকে অনেকেই ‘বিরোধাভাসপূর্ণ’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মনে করছেন।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, “র্যাবের বিলুপ্তি এখন জাতীয় দাবি। গুম কমিশন ও জাতিসংঘের প্রতিবেদন থাকা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার র্যাবকে বিলুপ্ত না করে উল্টো আরও বৈধতা দিচ্ছে, সক্ষমতা বাড়াচ্ছে—এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।” তাঁর মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় র্যাবের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ, তবুও এই বাহিনীর জন্য নতুন যানবাহন কেনার সিদ্ধান্ত সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করছে।
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, “সরকারের সময় প্রায় শেষ। এখন কেন র্যাবের জন্য গাড়ি কিনতে হচ্ছে, সে বিষয়ে সরকারকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে। সব প্রতিবেদন ও সুপারিশ কেন উপেক্ষা করা হচ্ছে? তাহলে কি সরকার কোনো স্বার্থান্বেষী মহলকে সুবিধা দেওয়ার জন্য এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে?”
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের চলতি বাজেট থেকেই এসব গাড়ি কেনা হবে। ‘র্যাব ফোর্সেসের আভিযানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্পের আওতায় এই ক্রয় সম্পন্ন করা হবে। যদিও প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, তবুও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এসে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ব্যয় বাড়ানো এবং নতুন অনুমোদন দেওয়াকে অনেকে রাজনৈতিক দায় এড়ানোর চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
প্রশ্ন উঠছে—একদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত একটি বাহিনী বিলুপ্তির সুপারিশ, অন্যদিকে সেই বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে শত কোটি টাকার সরকারি অর্থ ব্যয়ের সিদ্ধান্ত—এই দ্বৈত অবস্থান কি অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা ও সংস্কারমূলক অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে না?
এই প্রশ্নের স্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য উত্তর না দিলে র্যাবকে ঘিরে সরকারের এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও নৈতিক বিতর্ক আরও ঘনীভূত করবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

