চার প্রশ্নে এক ভোট—গণভোট নয়, গণমতের বিকৃতি -ফজলুল কবির মিন্টু

চারটি আলাদা, জটিল ও ভিন্নমাত্রিক প্রশ্নকে একত্র করে “হ্যাঁ” বা “না”—এই দুই বিকল্পে সীমাবদ্ধ করা কোনো গণতান্ত্রিক চর্চা হতে পারে না। এটি গণভোটের নামে জনগণের মতকে সংকুচিত ও বিকৃত করার একটি কৌশল মাত্র। একজন সচেতন নাগরিকের পক্ষে চারটি প্রশ্নের প্রতিটিতে একই সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত বা সম্পূর্ণ দ্বিমত হওয়া প্রায় অসম্ভব। তবুও তাকে বাধ্য করা হচ্ছে একটিমাত্র বোতামে চাপ দিয়ে সব প্রশ্নের ভাগ্য নির্ধারণ করতে। এ অবস্থায় প্রকৃত জনমত প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ কোথায়?
গণভোটের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জনগণের স্বাধীন ও স্পষ্ট মতামত জানা। কিন্তু যখন ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের চারটি প্রস্তাবকে এক সুতোয় বেঁধে একসাথে ভোটে তোলা হয়, তখন ভোটার আসলে নিজের মত নয়—বরং “কম ক্ষতিকর” বা “বাধ্যতামূলক” একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধ্য হয়। এতে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না, বরং দুর্বল হয়।
আমার ব্যক্তিগত অবস্থানই এই ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার একটি উদাহরণ। দ্বিতীয় প্রশ্নে প্রস্তাবিত উচ্চ কক্ষ বা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের ধারণার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণভাবে দ্বিমত পোষণ করি। আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় এই উচ্চ কক্ষ কার্যকর গণতন্ত্রের বদলে ক্ষমতার আরেকটি কেন্দ্র, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও জটিলতার জন্ম দেবে। এটি জনগণের প্রতিনিধিত্ব বাড়াবে—এমন কোনো শক্ত যুক্তি এখনো উপস্থাপন করা হয়নি।
অন্য প্রশ্নগুলোর ক্ষেত্রেও আমি দ্বিধাহীনভাবে বলতে পারছি না যে, সবগুলোর সঙ্গে আমি শতভাগ একমত। কিছু প্রস্তাবের মধ্যে ইতিবাচক দিক থাকতে পারে, কিছু অংশে সংশোধনের প্রয়োজন আছে। কিন্তু আলাদা আলাদা করে মত দেওয়ার সুযোগ না থাকায় আমাকে একটি সামগ্রিক সিদ্ধান্তে যেতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে একমাত্র সৎ ও নৈতিক অবস্থান হচ্ছে—“না” ভোট দেওয়া। কারণ আমি এমন একটি পদ্ধতিকে সমর্থন করতে পারি না, যা আমার মত প্রকাশের স্বাধীনতাকেই সংকুচিত করে।
এই গণভোট আসলে জনগণকে স্বাধীনভাবে ভাবার সুযোগ দিচ্ছে না। এটি জনগণকে বলছে—“সব নাও, নইলে সব ছেড়ে দাও।” গণতন্ত্র এমন কালো-সাদা চিন্তার জায়গা নয়। গণতন্ত্র মানে সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝা, ভিন্ন মতকে সম্মান করা এবং প্রতিটি বিষয়ে আলাদা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা।
যদি সত্যিই জনগণের মত জানতে চাওয়া হতো, তাহলে চারটি প্রশ্নকে চারটি আলাদা ব্যালটে বা আলাদা ভোটের মাধ্যমে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা যেত। তাহলে কেউ একটি প্রশ্নে “হ্যাঁ”, আরেকটিতে “না”, আরেকটিতে “দ্বিধা” বা ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারত। সেটাই হতো প্রকৃত গণভোট।
এই কারণেই আমি “না” ভোট দেব। কোনো একটি প্রশ্নের বিরোধিতা করার জন্য নয়, বরং পুরো পদ্ধতির বিরোধিতা করার জন্য। কারণ যে প্রক্রিয়া মানুষের মতামতকে খণ্ডিত ও বিকৃত করে, সেই প্রক্রিয়ার ফল যত ভালোই শোনাক না কেন—তা গণতান্ত্রিক হতে পারে না।
“না” ভোট মানে সংস্কারের বিরোধিতা নয়। আমি চাই সংস্কার হোক, কিন্তু তা হোক জনগণের প্রকৃত মতামতের ভিত্তিতে। বরং আমার “না” ভোট মানে গণতন্ত্রের নামে মতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো প্যাকেজ রাজনীতি প্রত্যাখ্যান।
এই গণভোটে আমার “না” তাই কোনো একক প্রশ্নের বিরুদ্ধে নয়; আমার “না” হচ্ছে—গণমতকে এক বোতামে বন্দি করার এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে।
(লেখকঃ সংগঠক, টিইউসি, কেন্দ্রীয় কমিটি)
