চলমান সংবাদ

জাহাজভাঙা শিল্প শ্রমিকদের জন্য ৩৬,০০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জোরালো দাবি

জাহাজভাঙা শিল্প শ্রমিকদের সাম্প্রতিক বাস্তব অবস্থা, দীর্ঘদিন ধরে অমানবিক মজুরি কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ ন্যূনতম মজুরি রোয়েদাদ প্রসঙ্গে দেশবাসী, শ্রম কর্তৃপক্ষ ও মালিকপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের উদ্যোগে আজ এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত গভীর ক্ষোভের সঙ্গে জানান, ২০১৮ সালে ঘোষিত জাহাজভাঙা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি রোয়েদাদ অনুযায়ী দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের ভিত্তিতে মাসিক ১৬,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও মালিকপক্ষ আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করেনি। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, মানববন্ধন, সমাবেশ-মিছিল, মালিক সমিতিকে লিখিত আবেদন এবং শ্রম পরিদর্শন অধিদপ্তরে একাধিক অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও রোয়েদাদ কার্যকর হয়নি। বরং কিছু মালিকপক্ষ দৈনিক ১২ ঘণ্টা কাজ করিয়ে ১৬,০০০ টাকা প্রদানকে ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন হিসেবে প্রচার করছে, যা শ্রম আইন লঙ্ঘন ও শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।

বক্তব্যে বলা হয়, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ জাহাজভাঙা দেশ। দেশের নির্মাণ খাতে ব্যবহৃত স্ক্র্যাপ লোহার প্রায় ৬০ শতাংশ এই শিল্প থেকে আসে। প্রায় ৮–১০ হাজার শ্রমিক সরাসরি এবং এক লক্ষাধিক মানুষ পরোক্ষভাবে এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল, যা জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ০.৫ শতাংশ অবদান রাখছে। অথচ এই উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পের শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত জীবনঝুঁকি নিয়ে কাজ করলেও ন্যায্য মজুরি ও মানবিক জীবনমান থেকে বঞ্চিত।

সংবাদ সম্মেলনে মজুরি বোর্ডের কাছে ২০২৫ সালের জন্য জাহাজভাঙা শিল্প শ্রমিকদের গ্রেড–৪ এর ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩৬,০০০ টাকা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি অন্যান্য গ্রেডে পর্যায়ক্রমে মজুরি বৃদ্ধির প্রস্তাব এবং শিক্ষানবিশদের জন্য ৩ মাসের প্রশিক্ষণকাল শেষে গ্রেড–৪ এ অন্তর্ভুক্তির দাবি উত্থাপন করা হয়।

বক্তারা বলেন, পাঁচ সদস্যের একটি শ্রমিক পরিবারের খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, ঝুঁকি ভাতা, যাতায়াত ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ন্যূনতম ব্যয় বিবেচনায় ৩৬,০০০ টাকার কম মজুরি কোনোভাবেই মানবিক বা বাস্তবসম্মত নয়। এই দাবি বাংলাদেশের সংবিধান, শ্রম আইন ২০০৬, জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা এবং আইএলও কনভেনশন–১৩১ এর সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

পড়ুন:  জাহাজভাঙা শ্রমিকদের শ্রম অধিকার ও পেশাগত স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে সীতাকুণ্ডে সমাবেশ ও মানববন্ধন

এছাড়া ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নের পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবনমান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও পাঁচটি দাবি উত্থাপন করা হয়—
১. শ্রম নিরাপত্তা নিশ্চিতে পরিদর্শন অধিদপ্তরের কার্যকর ভূমিকা
২. শিল্প এলাকায় ৫০ শয্যার হাসপাতাল, ক্যান্টিন ও আবাসনের ব্যবস্থা
৩. সকল শ্রমিককে নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র প্রদান
৪. প্রতিবছর মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি পুনঃনির্ধারণ
৫. ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মজুরি প্রদান বাধ্যতামূলক করা

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এ এম নাজিম উদিন, সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু, ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের সদস্য মোঃ আলী, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক মছিউদদৌলা, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক শ ম জামাল উদ্দিন, বিএফটিইউসি’র সাধারণ সম্পাদক কে এম শহিদুল্লাহ, বিএমএসএফ-এর যুগ্ম সম্পাদক মোঃ ইদ্রিস, জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মানিক মন্ডলসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

শেষে বক্তারা সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান—জাহাজভাঙা শিল্প শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি দ্রুত ৩৬,০০০ টাকা নির্ধারণ ও কার্যকর করার মাধ্যমে শ্রমিকদের প্রতি ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সংহতি নিশ্চিত করা হোক।