সাইফুদ্দিন খালেদ খসরু : আমাদের স্মৃতিতে অমর -ফজলুল কবির মিন্টু,

২০২৫ সালের ১১ আগস্ট আমরা হারিয়েছি আমাদের প্রিয় মানুষ, সাইফুদ্দিন খালেদ খসরু ভাইকে। মৃত্যুর সংবাদটি প্রথমে আসে তাঁরই একসময়ের সহপাঠী এবং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন চট্টগ্রাম জেলার সাবেক সভাপতি আতিক ভাইয়ের কাছ থেকে। সংবাদটি মুহূর্তেই আমাদের গভীর শোক ও শূন্যতায় নিমজ্জিত করে। যদিও খসরু ভাইয়ের শারীরিক অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই ভঙ্গুর ছিল, তারপরও এমন আকস্মিক বিদায় মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। জীবদ্দশায় তিনি তিনবার হার্ট অ্যাটাকের শিকার হয়েছিলেন, আর সেই সংগ্রামী জীবনযাপন তাঁকে হয়তো আরও ক্লান্ত করে তুলেছিল।
কর্মজীবন ও পেশাগত সাফল্য
খসরু ভাই পেশাগত জীবনে ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ ও দায়িত্বপরায়ণ। ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘ সময় কাজ করে গেছেন তিনি। সর্বশেষ তিনি ইউসিবিএল-এর দামপাড়া শাখার ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে ব্র্যাক ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে তাঁর যোগ্যতা ও নেতৃত্বগুণের পরিচয় দিয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে তাঁর নিষ্ঠা ও দক্ষতা কেবল সহকর্মীদের অনুপ্রাণিত করেনি, বরং যেকোনো প্রজেক্ট বা উদ্যোগকে সাফল্যের দিকে নিয়ে যেতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। অনেক সহকর্মী আজও তাঁকে স্মরণ করেন সৎ, আত্মপ্রত্যয়ী ও মানবিক সহকর্মী হিসেবে।
ছাত্রজীবন ও সংগঠকসত্তা
খসরু ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ৮০-এর দশকের শেষ দিকে, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কার্যক্রমের মাধ্যমে। তখন তিনি দায়িত্বশীল, সংগ্রামী ছাত্রনেতা হলেও একইসঙ্গে ছিলেন হাসি-খুশি, প্রাণবন্ত মানুষ। শত প্রতিকূলতা, দুঃখকষ্ট কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যার মাঝেও তাঁর মুখে লেগে থাকত এক অনাবিল হাসি। ছোট-বড় সবার সঙ্গে মেলামেশার অনন্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। যে কোনো পরিবেশে তিনি ছিলেন আলোকবর্তিকা, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরিয়ে দিতেন চারপাশ।
পরিবার ও প্রগতিশীল চেতনার বিকাশ
খসরু ভাইয়ের প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে পারিবারিক পরিবেশ ছিল মূল চালিকাশক্তি। তাঁর দাদা ছিলেন একজন কলেজ শিক্ষক ও এলাকায় পীর হিসেবে সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। আর তাঁর বাবা রশীদ আল ফারুকী ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও প্রথিতযশা সাহিত্যিক। এই পারিবারিক ঐতিহ্য খসরু ভাইয়ের মধ্যে উচ্চশিক্ষার প্রতি গভীর আকর্ষণ, সংস্কৃতিচর্চার প্রতি দায়বদ্ধতা এবং মানবিক মূল্যবোধকে গড়ে তুলেছিল।
স্মৃতির খণ্ডচিত্র
বছর দুই-তিন আগে আমরা কয়েকজন মিলে নোয়াখালিতে আমাদের বন্ধু ডা. ফজলে এলাহী মিলাদের ছোট ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেখানেই লক্ষ্য করি, খসরু ভাইয়ের শারীরিক অবস্থা অনেকটাই অবনতির দিকে গেছে। কথাবার্তায় ধারাবাহিকতা কমে এসেছিল, কিন্তু তাঁর স্বভাবসুলভ রসিকতা ও উজ্জ্বল হাসি তখনও অটুট ছিল। পরবর্তীতে আরো প্রায় এক বছর পরে পার্ক ভিউ হাসপাতালে তাঁকে দেখতে গেলে আমাদের উপস্থিতিতে যেন তিনি নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছিলেন। আলাপে প্রকাশ পেয়েছিল তাঁর চিরাচরিত আতিথ্য, মানবিকতা এবং প্রাণোচ্ছ্বলতা।
তবে মাঝে মাঝে তাঁর আলাপচারিতায় অনুভব করেছি চাকরিজীবনের প্রবল চাপ তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। হয়তো এই মানসিক চাপ এবং একাধিকবারের হার্ট অ্যাটাকের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিষয়টি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়—কাজ ও জীবনের ভারসাম্যহীনতা কতটা ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে।
সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা
খসরু ভাই ছিলেন উন্নত সংস্কৃতির ধারক এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে অকুতোভয় সংগ্রামী। সম্প্রতি মব উন্মাদনায় নুরাল পাগলার লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে রাস্তায় পুড়িয়ে ফেলার যে দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে, তা আমাদের সমাজের অবক্ষয়ের নির্মম দৃষ্টান্ত। খসরু ভাই সারা জীবন এমন কুসংস্কার, পশ্চাৎপদতা ও বর্বরতার বিরুদ্ধে ছিলেন। তাঁর জীবন আমাদের জন্য শিক্ষা হয়ে থাকবে—প্রগতিশীল, যুক্তিনিষ্ঠ ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণে আমাদের লড়াইকে অব্যাহত রাখতে হবে।
অমর স্মৃতির আলো
খসরু ভাই আজ আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেছেন। কিন্তু তিনি চিরকাল আমাদের হৃদয়ে বাস করবেন। তাঁর হাসি, মানবিক গুণাবলী, প্রগতিশীল চিন্তা ও সংগ্রামী জীবন আমাদের অনন্তকাল অনুপ্রেরণা জোগাবে। আমাদের কাছে তিনি কেবল একজন সহযোদ্ধা বা প্রিয় ভাই নন; তিনি এক আলোকবর্তিকা, যাঁর প্রদর্শিত পথ ধরে সমাজ ও মানবতার জন্য কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
খসরু ভাইয়ের জীবন আমাদের শিখিয়েছে—সততা, দায়িত্ববোধ, প্রগতিশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধই মানুষের প্রকৃত সম্পদ। আমরা যারা তাঁকে ভালোবেসেছি এবং তাঁর সান্নিধ্যে এসেছি, আমাদের দায়িত্ব হবে তাঁর স্বপ্ন ও আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখা। সমাজ পরিবর্তনের যে স্বপ্ন তিনি দেখতেন, আমাদের প্রতিটি কার্যক্রমের মাধ্যমে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে।
(লেখকঃ সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন চট্টগ্রাম জেলা)
