মতামত

রানা প্লাজার ভিক্টিমদের টাকা কেটে নেয়া নিম্নরুচির বহিঃপ্রকাশ 

-ফজলুল কবির মিন্টু

ফজলুল কবির মিন্টু (ফাইল ছবি)

গতকাল ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে। রানা প্লাজা ধস কেবল বাংলাদেশেই নয় বরং বিশ্বের ইতিহাসে এক ভয়াবহতম দুর্ঘটনা। এই ঘটনায় ১১৩৭ জন শ্রমিক প্রাণ হারায়। ১৫২৪ জন শ্রমিক মারাত্মকভাবে আহত হয় এবং ৭৮ জন শ্রমিক চিরতরে পঙ্গু হয়ে যায়। যারা মারা গেছেন তারা হয়তো মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একধরণের মুক্তি পেয়েছেন আর আহত বা পঙ্গু হয়ে যারা বেঁচে আছেন তারা এবং তাদের পরিবাররের সদস্যরা জানেন কী ভয়াবহ দুঃসহ যন্ত্রণা তারা বয়ে বেড়াচ্ছেন?  এসকল হতভাগ্য শ্রমিকদের যন্ত্রণার  ভয়াবহতা একমাত্র ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কেউ অনুমান করতে পাবেনা।

রানা প্লাজা ধস বাংলাদেশে একমাত্র দুর্ঘটনা নয়। এর আগেও অনেকগুলো দুর্ঘটনা ঘটেছিল এবং পরেও দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে।

উক্ত দুর্ঘটনাগুলোতে প্রচুর শ্রমিক নিহত আহত ও পঙ্গু হওয়ার ইতিহাস আমরা জানি। যেমন ২০০০ সালের ২৫ নভেম্বর নরসিংদীর চৌধুরী নিটওয়্যার এন্ড গার্মেন্টস লিঃ এ আগুনে পুড়ে ৫৩ জন শ্রমিক নিহত হয়। ২০০৫ সালের ১১ এপ্রিল সাভারে স্পেকট্রাম কারখানা ভবন ধসে ৭৪ জন শ্রমিক মারা যায়। ২০০৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের কালুর ঘাট শিল্প এলাকায় কেটিএস গার্মেন্টস এ আগুনে পুড়ে ৯১ জন শ্রমিক নিহত হয়। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর তাজরীন ফ্যাশনে আগুনে দগ্ধ হয়ে ১১২ জন শ্রমিক জীবন হারায়।

আহতের কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও এর সংখ্যা নিহত শ্রমিকদের দ্বিগুন/ত্রিগুন হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাছাড়া প্রতিটি দুর্ঘটনার পর রাষ্ট্র এবং মালিক পক্ষ মিলে আহত ও নিহতের সংখ্যা ধামাচাপা দেয়ার যে অশুভ প্রতিযোগিতা শুরু করে তাতে প্রকৃত তথ্য জানা আসলেই দুস্কর। সুতরাং নিহতের যে পরিসংখ্যান আমরা জানি বাস্তবে বেশি বৈ  কম হবেনা।

রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশে পোশাক কারখানাগুলোতে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কিছুটা উন্নতি পরিলক্ষিত হলেও বাংলাদেশে সার্বিকভাবে কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এখনো প্রচুর ঘাটতি রয়ে গেছে। ফলে রানা প্লাজার মত একটি ভয়াবহতম দুর্ঘটনার পরেও বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় শ্রমিকের নিহত এবং আহত হওয়া আজও বন্ধ হয়নি।

নারায়ন গঞ্জের রূপগঞ্জে সেজান জুস কারখানায় আগুনে পুড়ে ৫০ এর অধিক শ্রমিক নিহত হওয়া, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে বিএম কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নি বিস্ফোরণের কারনে ৫০ এর অধিক শ্রমিক নিহত হওয়া এনং সর্বশেষ সীমা অক্সিজেন প্লান্টে অগ্নি বিস্ফোরণে ৭ জনের বেশি শ্রমিক নিহত হওয়া প্রমাণ করে এখনো আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় তদারকি সংস্থা কিংবা মালিক পক্ষের নিকট কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়টি আগ্রধিকার পাওয়াতো দূরের কথা বরং চরমভাবে অবহেলিত।

কাজের বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করলে পোশাক শিল্প খাত ঝুকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্র নয়। তবুও বাংলাদেশের ইতিহাসে কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্ঘটনা এবং ভয়াবহতম দুর্ঘটনা ঘটেছে পোশাক শিল্প খাতে এবং কর্মস্থলে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক নিহত, আহত এবং পঙ্গু হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সমগ্র বিশ্বে রেকর্ড করেছে।

রানা প্লাজা ধসের পর একটা বিষয় ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। সেটা হচ্ছে প্রায় সকল দুর্ঘটনাই কাঠামোগত ত্রুটির কারনে ঘটেছে। যেমন রানা প্লাজা ধসের পরে জানা গেছে বিল্ডিংটি ৪ তলার অনমোদন ছিল কিন্তু বিল্ডিংটি ৮ তলা করা হয়েছিল এবং প্রত্যেক ফ্লোরে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন জেনারেটর ছিল। বিল্ডিংটিতে ৬টি ফ্লোরে পোশাক কারখানা ছিল। বিদ্যুৎ চলে গেলে একসাথে ৬টি ফ্লোরে জেনারেটর চালানো হতো। এতে বিল্ডিংএ প্রচুর কম্পন হতো। এধরনের কম্পনের ফলে একটা বিল্ডিং ধসে যেতে পারে তা আমাদের দেশের পোশাক কারখানার মালিক পক্ষ এবং রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থা যেমন- ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর সমূহ জানতো না অথবা শ্রমিকের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে তাদের কোন বিবেচনা বোধ কাজ করতোনা বলেই প্রতীয়মান হয়। তাদের এই অজ্ঞতা বা অবহেলার খেসারত দিতে হল হাজার হাজার শ্রমিককে জীবন দিয়ে, আহত হয়ে এবং পঙ্গু হয়ে।

রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশে পোশাক শিল্প খাতে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যে দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে তার কৃতিত্ব আমি মালিক পক্ষ বা রাষ্ট্রীয় তদারকি সংস্থা সমূহকে দিতে রাজী নই। কেননা রানা প্লাজা ধসের পর বায়ারদের জোট একর্ড এবং এলায়েন্স গঠিত না হলে আদৌ কোন পরিবর্তন হতো কিনা আমি যথেষ্ট সন্দিহান।

রানা প্লাজা ধসের ১০ বছর পূর্ণ হলেও এর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে এখনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তারচেয়েও হতাশার ১০ বছর পূর্তির এই মাসে এই ঘটনার অন্যতম প্রধান আসামী সোহেল রানাকে জামিন দেয়া। এই ঘটনার মাধ্যমে দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা এবং শ্রদ্ধাবোধ যদি কমে যায় তার দায় কে নিবে?

রানা প্লাজা ধসের ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় শ্রমিকনেতা আমিরুল হক আমির জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর দুর্ঘটনার শিকার হতাহত শ্রমিকদেরকে দুই কিস্তিতে ৬০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন সমূহের জোটের দাবির প্রেক্ষিতে বায়ারদের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা পাওয়ার পর  গঠিত তহবিল থেকে শ্রমিকদের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ থেকে উক্ত ৬০ হাজার টাকা করে কেটে নেয়া হয়। এটা একটা গুরুতর অভিযোগ বলেই আমি মনে করি। এই ধরণের ঘটনার মাধ্যমে রাষ্ট্র একদিকে নিম্নতম রুচিবোধের পরিচয় দিয়েছে অন্যদিকে শ্রমিকদের প্রতি তাদের চরম দায়িত্বহীনতার মনোভাবের বহিপ্রকাশ ঘটিয়েছে।

লেখকঃ ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠক