যে গল্পগুলো লেখা হয়নি-২৩: ভজলুল কবির মিন্টু

গ্রুপ বীমার টাকা আদায়

সুরাইয়া বেগম চট্টগ্রামের কালুরঘাটে অবস্থিত প্যানপার্ক অ্যাপারেলসের একজন সুইং অপারেটর ছিলেন। প্রতিদিনের মতো কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে হঠাৎ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। অসুস্থতার কারণে প্রায় দেড় মাস কারখানায় কাজে যোগ দিতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একমাত্র সন্তান মো. সোহেলের জীবনে নেমে আসে গভীর অনিশ্চয়তা।

মায়ের মৃত্যুর পর সোহেলের সামনে তখন শোক সামলে জীবন চালিয়ে নেওয়ার কঠিন বাস্তবতা। এই পরিস্থিতিতে মায়ের গ্রুপ বীমার টাকা পাওয়ার আশায় তিনি প্যানপার্ক অ্যাপারেলস কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিজিএমইএর কাছে আবেদন করেন। তাঁর প্রত্যাশা ছিল, মায়ের কর্মজীবনের অধিকার হিসেবে প্রাপ্য এই অর্থটুকু অন্তত তাঁর দুঃসময়ে কাজে আসবে।

কিন্তু আবেদন করার কিছুদিন পর বিজিএমইএর পক্ষ থেকে তাঁকে জানানো হয়, মৃত্যুর প্রায় দেড় মাস আগে থেকে তাঁর মা কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। এ কারণে তাঁদের পক্ষে গ্রুপ বীমার দাবিকৃত অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব নয়।

একদিকে মাকে হারানোর বেদনা, অন্যদিকে প্রাপ্য অর্থ না পাওয়ার হতাশা—দুইয়ের চাপে অসহায় হয়ে পড়েন সোহেল। কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও আর কোনো সহযোগিতা পাচ্ছিলেন না। তাঁর মনে তখন একটাই প্রশ্ন—অসুস্থ হয়ে কাজে অনুপস্থিত থাকার কারণে কি একজন শ্রমিকের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের ন্যায্য পাওনাও অনিশ্চিত হয়ে যাবে?

এ অবস্থায় সোহেল যোগাযোগ করেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের অঙ্গসংগঠন পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের চট্টগ্রাম জেলা সাধারণ সম্পাদক মো. হানিফের সঙ্গে। বিষয়টি জানার পর শ্রমিকের পরিবারের ন্যায্য অধিকার আদায়ে এগিয়ে আসে পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন ও বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

দুই সংগঠনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একপর্যায়ে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে (ডিআইএফই) একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতিনিধিরা। সেখানেই সুরাইয়া বেগমের চাকরির অবস্থা এবং তাঁর পরিবারের গ্রুপ বীমার অর্থ পাওয়ার অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়।

সভায় বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সংগঠক ফজলুল কবির মিন্টু আইনের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কোনো শ্রমিক ১০ দিনের বেশি অনুপস্থিত থাকলেও শ্রম আইন অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। কিন্তু শ্রমিকের অনুপস্থিতির কারণে তাঁকে চাকরিচ্যুত করার ক্ষেত্রে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। সুরাইয়া বেগমের ক্ষেত্রে কারখানা কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২৭(৩ক) ধারা অনুযায়ী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ফলে কেবল অনুপস্থিতির অজুহাতে তাঁকে চাকরিতে বহাল শ্রমিক হিসেবে বিবেচনা না করার যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি আরও যুক্তি দেন, সুরাইয়া বেগম যদি আইনগতভাবে ওই প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক হিসেবে বিবেচিত হন, তাহলে তাঁর মৃত্যুর পর গ্রুপ বীমার দাবি থেকে পরিবারকে বঞ্চিত করার সুযোগ নেই। তাঁর একমাত্র সন্তান মো. সোহেল আইনসংগতভাবেই মায়ের প্রাপ্য গ্রুপ বীমার অর্থ পাওয়ার অধিকার রাখেন।

আলোচনার একপর্যায়ে সভায় উপস্থিত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এই যুক্তির সঙ্গে একমত পোষণ করেন। সোহেলের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে অবশেষে তাঁর ন্যায্য পাওনা আদায়ের পথ তৈরি হয়।

সেই সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রতিফলন ঘটে ৫ ডিসেম্বর। বিজিএমইএর পক্ষ থেকে মো. সোহেলের হাতে গ্রুপ বীমার দাবির বিপরীতে ২ লাখ টাকার একটি চেক হস্তান্তর করা হয়।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর মায়ের প্রাপ্য অর্থ হাতে পাওয়ার মধ্য দিয়ে সোহেলের লড়াইয়ের অবসান ঘটে। এই অর্থ মাকে ফিরিয়ে দিতে পারেনি, মায়ের শূন্যতাও পূরণ করতে পারেনি। কিন্তু অন্তত মায়ের শ্রমজীবনের সঙ্গে যুক্ত একটি ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন শ্রমিকের অধিকার শুধু তাঁর জীবদ্দশার মজুরি কিংবা সুযোগ-সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর মৃত্যুর পরও আইন অনুযায়ী প্রাপ্য সুবিধা পরিবারের কাছে পৌঁছানো জরুরি। অসুস্থতার কারণে কাজে অনুপস্থিত থাকলেই একজন শ্রমিকের অধিকার অস্বীকার করা যায় না। আর কোনো প্রতিষ্ঠান সেই অধিকার আদায়ে সহযোগিতা না করলে সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলন ও আইনের যথাযথ প্রয়োগই হয়ে উঠতে পারে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ।

সুরাইয়া বেগমের গল্প তাই শুধু দুই লাখ টাকার একটি চেক পাওয়ার গল্প নয়। এটি একজন অসহায় সন্তানের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাওয়ার গল্প। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে, শ্রমিকের অধিকার আদায়ে সম্মিলিত উদ্যোগ ও আইনের সঠিক ব্যাখ্যা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

যে গল্পগুলো লেখা হয়নি—সেসব গল্পের প্রতিটিতে রয়েছে অধিকার আদায়ের লড়াই, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায় এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়।