যে গল্পগুলো লেখা হয়নি-১০: শাহজাহানের ৭৫ হাজার টাকা আদায় -ফজলুল কবির মিন্টু
সিদ্ধান্ত হয়েছিল ১৩ মার্চ ২০২৩ ।
আর ২০ মার্চ ২০২৩ ছিল সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দিন।
এস এ গ্রুপের গাড়িচালক মোঃ শাহজাহান। একসময় হঠাৎ করেই তার চাকরি নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। কর্তৃপক্ষ তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। এরপর আসে স্থায়ীভাবে বরখাস্তের আদেশ।
একজন শ্রমিকের জন্য চাকরি হারানোর খবর মানে শুধু একটি চাকরি হারানো নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, ঘরভাড়া, চিকিৎসা—আর থাকে আগামী দিনের অনিশ্চয়তা।
শাহজাহানের বিষয়টি আমার কাছে নিয়ে এসেছিলেন হালকা মোটরযান শ্রমিক ইউনিয়নের অন্যতম নেতা মোঃ সামসুল ইসলাম আরজু ভাই ও আমির হোসেন ভাই।
আমরা শাহজাহানকে দেওয়া কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন কাগজপত্র পরীক্ষা করে দেখলাম। কাগজগুলো বলছিল এক কথা, কিন্তু আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না—সেখানে ছিল বড় প্রশ্ন।
আমরা সেই প্রশ্নটিই তুললাম।
শাহজাহানকে বরখাস্ত করার প্রক্রিয়াটি আইনসম্মত হয়নি—এই বিষয়টি আমরা চ্যালেঞ্জ করলাম। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হলো, আইনগত দিক তুলে ধরা হলো। আমাদের অবস্থান ছিল পরিষ্কার—একজন শ্রমিককে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হলে আইন মেনে করতে হবে এবং তার আইনসংগত পাওনা তাকে দিতে হবে।
শেষ পর্যন্ত আমাদের সেই চ্যালেঞ্জ সফল হলো।
মালিকপক্ষ শাহজাহানের আইনসংগত পাওনা পরিশোধ করতে বাধ্য হলো।
তারপর এলো ২০ মার্চ ২০২৩।
সেদিন এস এ গ্রুপের ডেপুটি ম্যানেজার জনাব মোঃ ফরমান উদ্দিন শাহজাহানের হাতে তুলে দিলেন ৭৫ হাজার টাকার চেক। পাশে ছিলেন মোঃ সামসুল ইসলাম আরজু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ লেবার ফেডারেশন, চট্টগ্রাম জেলা কমিটি।
শাহজাহানের হাতে যখন চেকটি উঠল, তখন হয়তো সেখানে বড় কোনো সংবাদ ছিল না। ক্যামেরার ঝলকানি ছিল না, সংবাদপত্রের শিরোনামও হয়নি।
কিন্তু একজন শ্রমিকের জীবনে এই ৭৫ হাজার টাকা ছিল অনেক বড় কিছু।
এটি ছিল তার শ্রমের মূল্য।
এটি ছিল তার ন্যায্য অধিকার।
আর সবচেয়ে বড় কথা—এটি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অধিকার আদায়ের একটি ছোট্ট বিজয়।
শ্রমিকের অধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এমন অসংখ্য ঘটনা সামনে আসে। কিছু ঘটনা আলোচনায় আসে, কিছু হারিয়ে যায় সময়ের ভিড়ে।
শাহজাহানের গল্পটিও হয়তো তেমনই একটি গল্প।
যে গল্পগুলো লেখা হয়নি।
কিন্তু আমরা যারা শ্রমিকের অধিকার নিয়ে কাজ করি, তাদের কাছে প্রতিটি পাওনা আদায়ের গল্পই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি শ্রমিকের অধিকার রক্ষা মানে শুধু একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো নয়—এটি অন্য শ্রমিকদেরও সাহস দেয়।
শাহজাহানের হাতে তুলে দেওয়া সেই ৭৫ হাজার টাকার চেক তাই আমার কাছে শুধু একটি চেক নয়; এটি ছিল আইন মেনে ন্যায্য অধিকার আদায় করা যায়—তার একটি প্রমাণ।