যে গল্পগুলো লেখা হয়নি–৭ -ফজলুল কবির মিন্টু
আলমগীর আজ ঈদ করতে বাড়ি যাচ্ছে
ঘটনা কালঃ এপ্রিল ২০২২
আলমগীর চট্টগ্রামের একটি পোশাক কারখানায় লাইন সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করত। তার অধীনে কয়েকজন অপারেটর কাজ করতেন।
একদিন তার অধীনে কর্মরত দুইজন অপারেটর ফ্লোর ইনচার্জের মনগড়া উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। এ অপরাধে তাদের মারধর করে কারখানা থেকে বের করে দেওয়া হয়। ঘটনাটির প্রতিবাদ ও পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে আলমগীরও কর্তৃপক্ষের রোষানলে পড়ে। একপর্যায়ে তাকেও চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হয়।
আলমগীরের চাকরি চলে যাওয়ার খবর পেয়ে আমি বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলি। আলোচনা ও মধ্যস্থতার একপর্যায়ে সে আবার চাকরি ফিরে পায়।
আমি ভেবেছিলাম, এবার হয়তো সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলবে।
কিন্তু কিছুদিন পর আবার খবর এলো—আলমগীরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
আমার মনে হলো, তাকে হয়তো কোনোভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আলমগীর আমার কাছে এলো। তার কথা শুনলাম। এরপর তার পক্ষে কারণ দর্শানোর জবাবটি আমি লিখে দিলাম।
জবাব দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষ আর তাকে কোনোভাবে বিরক্ত করেনি। আলমগীর আবার স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে শুরু করল।
তারপর কেটে গেল কিছুদিন। এরপর এলো সেই মহেন্দ্রক্ষন -৩০ এপ্রিল ২০২২।
এপ্রিল মাসের বেতন ও বোনাস পেয়েছে আলমগীর। সামনে ঈদ। আজ সে বাড়ি যাচ্ছে।
বাড়ি যাওয়ার আগে হঠাৎ আমাকে ফোন করল।
কণ্ঠে তার আনন্দ। সেই আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে কৃতজ্ঞতা।
বলল,
‘ভাই, আপনার কারণে আমি আবার চাকরিটা ফিরে পেয়েছি। আমার বৃদ্ধ অসুস্থ বাবা আছেন। আমাদের ছয়জনের সংসার। চাকরিটা চলে গেলে আমরা খুব বিপদে পড়ে যেতাম।’
কথাগুলো শুনতে শুনতে আমারও মনে হলো—একজন মানুষের চাকরি ফিরে পাওয়া মানে শুধু একজন মানুষের কর্মসংস্থান ফিরে পাওয়া নয়; তার সঙ্গে একটি পুরো পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বনটাও ফিরে পাওয়া।
কথা প্রসঙ্গে আলমগীর হঠাৎ জানতে চাইল,
‘ভাই, আপনাকে আমি কী উপহার দেব?’
আমি বললাম,
‘তুমি যে চাকরিটা ফিরে পেয়েছো, এটাই তো আমার কাছে সবচেয়ে বড় উপহার। তোমার পরিবার নিয়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারাটাই আমার আনন্দ।’
আসলে অন্যায়-অবিচারের শিকার কোনো শ্রমিকের পাশে দাঁড়ানোর আনন্দটা অন্যরকম।
কোনো শ্রমিক যখন অসহায় হয়ে আসে, তার চোখে যখন চাকরি হারানোর ভয় দেখি, তখন তার পাশে দাঁড়ানোকে আমি কখনো দয়া হিসেবে দেখি না। এটা তার অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের অংশ।
আলমগীরের ঘটনাটিও তাই আমার কাছে শুধু একজন শ্রমিকের চাকরি ফিরে পাওয়ার ঘটনা নয়। এটি আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছিল—শ্রমিকের অধিকার কোনো ব্যক্তির দয়া বা সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়।
শ্রমিকদের চূড়ান্ত অধিকার নিশ্চিত করতে হলে তাদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার, ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার এবং সম্মিলিত দরকষাকষির অধিকার বাস্তবে নিশ্চিত করতে হবে। আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮-এর আলোকে এসব অধিকার বাস্তবায়ন জরুরি।
সেদিন আলমগীর ঈদ করতে বাড়ি যাচ্ছিল।
তার হাতে ছিল বেতন ও বোনাস।
মনে ছিল চাকরি ফিরে পাওয়ার স্বস্তি।
আর আমার কাছে?
তার ফোনকলটাই ছিল সবচেয়ে বড় উপহার।
কারণ একজন শ্রমিক যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে তার জীবিকার অধিকারটি ফিরে পায়, তখন তার মুখের স্বস্তির চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে!
কিছু গল্প লেখা হয় না।
কিছু গল্প শুধু মানুষের মুখে, কৃতজ্ঞতার কণ্ঠে আর স্মৃতির ভাঁজে বেঁচে থাকে।