জিয়ার পাওনা আদায়ের গল্প – ফজলুল কবির মিন্টু

মো. জিয়াউর রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সালে ইসলাম প্যাক এন্ড এক্সেসরিজ লিমিটেডে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। একজন সাধারণ শ্রমিক হিসেবে নিজের শ্রম, সময় আর ঘাম দিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানের কাজে যুক্ত ছিলেন। প্রায় এক বছর নয় মাস কেটে গেল। কিন্তু ২০১৬ সালের ২৯ অক্টোবর হঠাৎ করেই তার জীবনে নেমে এলো অনিশ্চয়তা।

কোনো লিখিত নোটিশ নয়, কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াও নয়—মালিকপক্ষ তাকে মৌখিকভাবে চাকরি থেকে টার্মিনেট করে দিল। এরপর কারখানায় যেতেও তাকে নিষেধ করা হলো।

চাকরি হারানোর কষ্টের সঙ্গে যোগ হলো আরও একটি আঘাত। জিয়া তার আইনগত পাওনা—টার্মিনেশনজনিত ক্ষতিপূরণ—দাবি করলে কারখানা কর্তৃপক্ষ তার সঙ্গে অশোভন আচরণ করে তাকে বের করে দেয়। এমনকি অক্টোবর মাসের বেতনটুকুও তাকে দেওয়া হয়নি।

একজন শ্রমিকের কাছে সেই ১৫ হাজার টাকা হয়তো কেবল একটি অঙ্ক নয়। সেটি তার পরিবারের খাবার, সন্তানের প্রয়োজন, ঘর-সংসারের খরচ। তাই অন্যায়ের কাছে চুপ করে না থেকে জিয়া সাহায্যের জন্য যোগাযোগ করেন পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন, চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক মো. হানিফের সঙ্গে।

হানিফ বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ—বিলস, চট্টগ্রামের প্যারালিগ্যাল সদস্য ফজলুল কবির মিন্টুর সঙ্গে। এরপর চট্টগ্রাম জেলা আইন সহায়তা কেন্দ্রের মাধ্যমে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম ১ম শ্রম আদালতে জিয়ার পক্ষে মামলা দায়ের করা হয়।

মামলার শুনানি চলল। কিন্তু মালিকপক্ষ আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় একতরফা শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শ্রমিক পক্ষ তাদের বক্তব্য ও দাবির পক্ষে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো আদালতের সামনে তুলে ধরে।

অবশেষে এলো সেই দিন—২৮ মার্চ ২০১৯।

চট্টগ্রাম ১ম শ্রম আদালতের মাননীয় চেয়ারম্যান শ্রমিক জিয়ার পাওনা পরিশোধের নির্দেশ দেন। অক্টোবর ২০১৬-এর বকেয়া মজুরি ১৫,০০০ টাকা, চার মাসের মূল মজুরি বাবদ নোটিশ পে ৩৬,০০০ টাকা এবং এক বছর চাকরির ক্ষতিপূরণ বাবদ ৯,০০০ টাকা—সব মিলিয়ে মোট ৬০,০০০ টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। রায় প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সমুদয় অর্থ পরিশোধ করতে বলা হয়।

জিয়ার জন্য এটি শুধু ৬০ হাজার টাকা পাওয়ার ঘটনা ছিল না। এটি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাওয়ার একটি ছোট্ট বিজয়।

একজন শ্রমিক যখন একা হয়ে যায়, তখন তার পাশে দাঁড়ানো মানুষ, সংগঠন ও আইনগত সহায়তা তার জন্য নতুন আশার দরজা খুলে দিতে পারে। জিয়ার গল্প তাই শুধু একজন শ্রমিকের গল্প নয়; এটি শ্রম, অধিকার এবং ন্যায়ের প্রতি আস্থার গল্প।

মেহনতি মানুষের জয় হোক।
দুনিয়ার মজদুর এক হও।