মতামত

ভারতের প্রথম একনায়কতন্ত্র : জরুরী আইন ,১৯৭৫-৭৭”

(১) ১৯৭৫ সালের ২৫শে জুন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী জরুরি আইন ঘোষণা করেন। এই জরুরি আইন নিয়ে গবেষণাধর্মী পুস্তক প্রকাশ করেন লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক ডক্টর ক্রিস্টোফ জ্যাফ্রলট (Dr. Christophe Jaffrelot) এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি প্রার্থী প্রতিনাভ অনিল (Pratinav Anil)। বইটি অক্সফোর্ড প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় ২০২১ সালে। গবেষকগণ এই জরুরি আইনকে ভারতের প্রথম “সাংবিধানিক একনায়কতন্ত্র” (Constitutional dictatorship) বলে উল্লেখ করেছেন।” INDIA’S FIRST DICTARSHIP THE EMERGENCY , 1975-1977″ । লেখকগণ এই বইকে ‘৭৫-এর জরুরি আইনের ওপর প্রথম গবেষণাধর্মী একাডেমিক বই বলে দাবি করেন। দিল্লি, হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশের বাইরে দক্ষিণাঞ্চলেও এর  দুর্বল প্রভাব নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেন তারা।
জরুরি আইনের মাধ্যমে ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র সঞ্জয় গান্ধী ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী হন এবং নিজস্ব ধরনের (own version) ইমার্জেন্সি জারি করেন। সঞ্জয় গান্ধী প্রথমত: ফ্যামিলি প্ল্যানিং-এর মাধ্যমে জোরপূর্বক প্রায় ১১ মিলিয়ন, মূলত দরিদ্র মানুষকে বন্ধ্যাকরন বা সন্তান উৎপাদন বা ধারণক্ষমতা লোপ করেন (Sterilization)। দ্বিতীয়ত: সৌন্দর্যবর্ধনের (beautification) নামে বিশেষ করে দিল্লি, হরিয়ানা এবং পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ থেকে হাজার হাজার দরিদ্র বস্তিবাসীকে শহর থেকে প্রান্তে সরিয়ে দেন (gentrification)। এক্ষেত্রে সঞ্জয় গান্ধীর পরিকল্পনা অনুযায়ী সংঘঠিত হয় টার্কমান গেট বস্তী উচ্ছেদ ( Turkman Gate demolition)  এবং দাঙ্গা । যেখানে নিহদের সংখ্যা লেখকের মতে হাজারের ঘরে । এদের অধিকাংশই ছিলেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দরীদ্র  ।
ভৌগোলিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হচ্ছে—দিল্লি, হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশ ছাড়া এই ইমার্জেন্সি ভারতের কেরালা, তামিলনাড়ুসহ দক্ষিণের অন্যান্য প্রদেশে তেমন কোনো প্রভাবই ফেলে নাই। সেই কারণে ইমার্জেন্সির পর ১৯৭৭-এ যে নির্বাচন হয় সেখানে দেখা যায়, কেন্দ্রে ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেস বিরোধী জোট ‘জনতা পার্টি’-র নেতৃত্বে ক্ষমতাচ্যুত হলেও দক্ষিণের প্রায় সকল রাজ্যে কংগ্রেস বিজয়ী হয় এবং প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীত্ব কংগ্রেস নেতৃত্বের বাইরে চলে যায়। যেহেতু ইমার্জেন্সি কেন্দ্রের বাইরে কোনো প্রভাব ফেলে নাই এবং ইমার্জেন্সির কারণে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলেও ইন্দিরা গান্ধীসহ কংগ্রেস নেতৃত্বকে কোনো বিচার বা জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয় নাই, সেই কারণে ১৯৭৭-এর নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী এবং সঞ্জয় গান্ধী পরাজিত হলেও ১৯৮০ সালের জানুয়ারির নির্বাচনে কংগ্রেস কেন্দ্রে পুনরায় ক্ষমতায় আসে এবং ইন্দিরা গান্ধী পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হন।
লেখকগণ এর অন্যতম কারণ হিসেবে ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ ব্যক্তিত্ব বা “ক্যারিজমা”-র কথা উল্লেখ করেন। সমাজবিজ্ঞানে ক্যারিজমার ধারণা দেন সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার। তিনি বলেন, ক্যারিজম্যাটিক নেতা ভালো গুণসম্পন্ন নাও হতে পারেন। ক্যারিজম্যাটিক মানে যিনি সকল প্রকার জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে। তিনি এমন কিছু “ব্যতিক্রমধর্মী” কাজ করেন যা মানুষকে মোহিত করে, মন্ত্রমুগ্ধ করে। তিনি ইমার্জেন্সি দিয়েছেন, নিউক্লিয়ার পরীক্ষা চালিয়েছেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানকে ভেঙে দুই টুকরা করেছেন। সেই প্রেক্ষাপটে আজকে ভারতের হিন্দুত্ববাদী প্রধানমন্ত্রীকেও একইভাবে উল্লেখ করা যায়—ক্যারিজম্যাটিক, হিন্দুত্ববাদী, জনতুষ্টবাদী এবং জবাবদিহিতা ও বিচারের ঊর্ধ্বে।
(২) শ্রীমতী গান্ধী গণতন্ত্রের নামেই এই জরুরি আইন ঘোষণা করেন—”She abolished democracy in the name of democracy”, পাকিস্তানি জেনারেলগণ যা করে থাকেন প্রতি ১০ বছর অন্তর। সেই সময় বিহারের সমাজতান্ত্রিক নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণের (জে পি মুভমেন্ট) নেতৃত্বে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম চলছিল, জরুরি আইনের মাধ্যমে সেসব প্রতিবাদ-বিক্ষোভ নিষিদ্ধ হয়। সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, ট্রেড ইউনিয়নিস্টসহ প্রায় এক লক্ষ জন দশ হাজার গ্রেফতার হন। প্রতিবাদ, আন্দোলন, গণগ্রেফতার এবং নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে বর্তমান হিন্দু জাতীয়তাবাদী শাসক ও নেতাদের অনেকেই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সেই সময় গ্রেফতার এড়াতে আত্মগোপনে থেকে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ ( আর এস এস) সংঘঠিত করার কাজে পুরপুরি নিবেদিত ছিলেন ।
গণতন্ত্র রক্ষা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নামে জরুরি আইন জারি হলেও বস্তুত দরিদ্র জনগণের কোনো কল্যাণ সাধিত হয়নি। পার্লামেন্টসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জরুরি আইনকে সমর্থন করে এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গণতান্ত্রিক ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়। সেই সময় যা ঘটেছিল, এখনো বিভিন্ন মাত্রায় ভারতে তাই ঘটে চলেছে। ‘৭৫-এর জরুরি আইনের মাধ্যমে যে সত্য প্রকাশিত হয়, তা বিজেপি শাসনামলেও একইভাবে কার্যকর আছে। এই বইয়ে জরুরি আইনের মাধ্যমে ভারতে কীভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থান হয়েছে, তা বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে।
(৩) জরুরি আইন কার্যকর ছিল ১৯৭৫-এর ২৫শে জুন থেকে ১৯৭৭ সালের ২১শে মার্চ পর্যন্ত ২১ মাসব্যাপী; যে সময়কে ভারতের ইতিহাসের “অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়” বলে উল্লেখ করা হয়। নাগরিক অধিকার হরণ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকোচন, গণগ্রেফতার এবং নির্বাচন বাতিল হয়। এই জরুরি আইনের মাধ্যমেই ভারতে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী শক্তি আরএসএস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ) ভারতের মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করে এবং পরবর্তীতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ দৃশ্যমান শক্তি হিসেবে অলিখিত এবং অঘোষিতভাবে “জরুরি আইন” জারি রাখে, যা বর্তমানে প্রকটভাবে দৃশ্যমান। এই জরুরি আইনকে ভারতের রাজনীতিতে একটি দিকবদলের সন্ধিক্ষণ বা টার্নিং পয়েন্ট বলে শনাক্ত করা যায়।
ইন্দিরা গান্ধী কর্তৃক জারিকৃত এই জরুরি আইনের মাধ্যমে চারটি পরিবর্তন স্পষ্ট হয়:
প্রথমত: ভারতের রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের প্রকোপ বৃদ্ধি (Criminalization of politics)।
দ্বিতীয়ত: ইমার্জেন্সির খলনায়কগণ প্রায় সকলেই পরবর্তীতে ভারতের রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। উনাদের কেউ কেউ ১৯৮৪ সালে শিখ দাঙ্গায় জড়িত ছিলেন। রাজনীতিতে নবাগত অনেকেই ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র সঞ্জয় গান্ধীর কৃপায় উচ্চপদে আসীন হন।
তৃতীয়ত: জরুরি আইনের ভেতর দিয়েই ক্রোনি ক্যাপিটালিজম (Crony capitalism) বা নয়া উদারবাদী অর্থনীতির বিকাশ ঘটে।
চতুর্থত: এই ইমার্জেন্সির মাধ্যমেই আরএসএস এবং সংঘ পরিবার ভারতের রাজনীতির মূলধারায় শক্ত অবস্থান নির্মাণ করে।
(৪) কেন ইন্দিরা গান্ধী জরুরি আইন ঘোষণা করেছিলেন? ১৯৭৪ সালে গুজরাটে কংগ্রেস নেতার বিরুদ্ধে ছাত্র ধর্মঘট, বিহারে ছাত্র ধর্মঘট, পরে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে শুরু হয় সম্পূর্ণ ক্রান্তি বা সম্পূর্ণ বিপ্লব। জর্জ ফার্নান্দেজের নেতৃত্বে শুরু হয় বিরাট রেলওয়ে ধর্মঘট।
১৯৭৫-এর জুনে ইমার্জেন্সি ঘোষণার একটি অন্যতম কারণ ছিল ১৯৭১-এর নির্বাচন। এই নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী এবং কংগ্রেস পার্টি বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। এই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে এলাহাবাদ কোর্টে মামলা করেন ইন্দিরা গান্ধীর প্রতিদ্বন্দ্বী রাজ নারায়ণ। ১৯৭৫ সালে সেই মামলার রায় ঘোষিত হয় এবং নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে রায় দেয়া হয়। ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচন বাতিল করা হয় এবং ছয় বছরের জন্য তাঁকে রাজনীতি থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়। সুপ্রিম কোর্টে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন ইন্দিরা গান্ধী। সেই রায়ও ইন্দিরা গান্ধী মানতে পারেননি। বিরোধীরা ইন্দিরার পদত্যাগের দাবি জানান। ক্ষমতা হারানোর ভয়ে ভীত ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দীন আলী আহমেদ জরুরি আইন ঘোষণা করেন।
দিল্লির সংবাদপত্রগুলোর সকল অফিস পাড়ায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় যেন কোনো পত্রিকা প্রকাশিত হতে না পারে। ভারতবাসী পরের দিন জরুরি আইনের সংবাদ পান অল ইন্ডিয়া রেডিওতে। এই হলো ২১ মাসের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ এবং সকল ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপের শুরু। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা ও প্রতিবাদের অধিকার হরণসহ সকল মৌলিক অধিকার হরন করা হয় । শুরু হয় গণগ্রেফতার। জর্জ ফার্নান্দেজ, জয়প্রকাশ নারায়ণ, অটল বিহারী বাজপেয়ী, এল কে আদভানি, মোরারজি দেশাইসহ গ্রেফতার হন প্রায় এক লক্ষ দশ হাজার মানুষ। যেহেতু পার্লামেন্টে কংগ্রেসের মেজরিটি ছিল, তাই এমন আইন পাশ করা হয় যাতে ইমার্জেন্সিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা না যায়। আইন পাশ হয় যেন প্রধানমন্ত্রীর পদকে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা না যায়। সংসদকে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দেয়া হয় এবং সেই সংশোধন নিয়ে কোনো রিভিউ করা যাবে না এমন আইনও পাশ হয়। বিচার বিভাগের ক্ষমতা পূর্ণরূপে লুপ্ত করা হয়। সকল প্রকার জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থেকে সঞ্জয় গান্ধী হয়ে ওঠেন ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী। বর্তমানে লেখকগণ এই শাসনকে “সুলতানি শাসন” বলেও উল্লেখ করেছেন, যা ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের জন্য সুখবর বয়ে আনে না।
(৫) জরুরি আইনের আশু কারণ ছাড়াও বইয়ের অপর লেখক প্রতিনাভ অনিল আরো কিছু রাজনৈতিক কারণের কথা উল্লেখ করেন:
১. ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেস পার্টিকে অপ্রাতিষ্ঠানিকীকরণ (Deinstitutionalization) বা দুর্বল করেন।
২. কর্মসূচি হিসেবে ঘোষিত ভূমি সংস্কারে ব্যর্থতা।
১৯৬৬ সালে ইন্দিরা গান্ধী  প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৬৭-র নির্বাচনে পার্টির বড়ো বড়ো দক্ষিণপন্থী নেতারা (Party boss) পরাজিত হন। কংগ্রেস পার্টির বামপন্থী অংশ নেতৃত্ব পর্যায়ে আসে। ইন্দিরা গান্ধী ডানপন্থী অবস্থান ত্যাগ করেন (Damascene conversion) এবং বামপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন। ‘৭১-এর ইলেকশনে বামদের কারণে ভূমি সংস্কার এবং দারিদ্র্য দূরীকরণের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন এবং বিপুল বিজয় পান। তিনি এমন একটা সময় এই ঘোষণা দেন যখন ভারতের প্রতি পাঁচ জনের চার জনই ছিলেন দরিদ্র ও ভূমিহীন। কিন্তু দিন যত যেতে থাকে, ততই পরিষ্কার হয় যে মিসেস গান্ধীর সমাজতন্ত্রের জনতুষ্টবাদী ঘোষণা এবং তার বাস্তবায়ন এক বিষয় নয়। একদিকে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে পার্টি দুর্বল করা, অন্যদিকে ভূমি সংস্কারের বিরুদ্ধে দলীয় মুখ্যমন্ত্রীদের সম্পূর্ণ অনিচ্ছা—এসব কারণে গান্ধী উচ্চশ্রেণির “এলিটদের” এবং ভূমিহীন দরিদ্র জনগোষ্ঠী উভয় শ্রেণিকেই বিচ্ছিন্ন (Alienate) করেন। একই সাথে কথিত ও ব্যর্থ “সবুজ বিপ্লবের” (Green revolution) কারণে দরিদ্র শ্রেণি আরো দরিদ্র হয়।
তিন ভাগের এক ভাগ অঞ্চলে মাওবাদী বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং পশ্চিম বাংলায় কৃষক বিদ্রোহ শুরু হয় যা রাজ্য শাসকগণ নির্মমভাবে দমন করেন। ‘৭০-এর দশকের শুরু থেকেই কৃষক আন্দোলন ছাড়াও ছাত্র, মধ্যবিত্ত, ভূস্বামী ও কর্মজীবী মানুষের অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে। ভূস্বামীদের সাথে পশ্চিমাদের বাণিজ্য শর্তে শিল্প ও কৃষির দ্বন্দ্ব, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন পঙ্গু করে দেয়া, ধনীদের আয় সংকোচন, ছাত্রদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ—সবকিছু মিলিয়ে শুরু হয় বিহারের জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে গান্ধী বিরোধী আন্দোলন (JP movement)। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ আন্দোলন, যার পরিণতিতে আসে মিসেস গান্ধীর ইমার্জেন্সি বা “ইন্ডিয়ার প্রথম একনায়কতন্ত্র” (The First Dictatorship of India)।
এই ইমার্জেন্সি প্রায় দুই বছর স্থায়ী হওয়ার কারণ হিসেবে লেখক বলছেন যে, কংগ্রেসের ভেতর এবং বাইরে বৃহৎ স্বার্থের সমর্থন ছিল এবং জরুরি আইনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ছিল দুর্বল। এই ইমার্জেন্সি অজনপ্রিয় ছিলো না। একজন বিরোধী লোকসভা সাংসদ বলেন, “If she keeps up, we might have a dictatorship by popular will”। জরুরি আইনকে সাপোর্ট করেছিল কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া, ব্যক্তিমালিকানাধীন  শিল্প সাম্রাজ্য, পশ্চিমা কর্পোরেট স্বার্থ , আমলাতন্ত্র এবং মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবীদের বড়ো অংশ। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এবং উপাচার্য কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন মেনে নেন। অনেক পুলিশকে ছাত্র হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় গোয়েন্দা তৎপরতা চালানোর জন্য। বস্তুত বাম এবং ডানের বড়ো অংশই এই জরুরি আইনের প্রতি সমর্থন দেয়। কমিউনিস্ট থেকে পুঁজিপতি, নিম্নবর্ণ থেকে ব্রাহ্মণ বুদ্ধিজীবী, আমলাতন্ত্র থেকে বুর্জোয়াজি—সবার সাপোর্টের তুলনায় প্রতিরোধ ছিল দুর্বল।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং দ্য স্টেটসম্যানের মতো মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি পত্রিকা অনিয়মিতভাবে গণতন্ত্রের কথা বলে। জুডিশিয়ারির মধ্যে মাত্র কয়েকটি হাইকোর্ট আইনবহির্ভূত গ্রেফতারকে চ্যালেঞ্জ করলেও সুপ্রিম কোর্ট এসবের পক্ষেই অবস্থান নেয়। হিন্দু ন্যাশনালিস্ট আরএসএস জরুরি আইনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, অনেকেই গ্রেফতার বরণ করেন। যদিও তা গণতন্ত্রের জন্য ছিল না, হেজিমনি (Hegemony) বা সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারই ছিলো আরএসএসের মূল উদ্দেশ্য।এ ছাড়াও আর এস এসের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি আপোষমূলক চিঠিও পাঠানো হয়েছিল । আরএসএস, সিপিএম (মার্ক্সবাদী) এবং সমাজতন্ত্রী ছাড়া যেহেতু তেমন কোনো শক্তিশালী প্রতিরোধ জরুরি আইনের বিরুদ্ধে ছিলো না, তাই ২১ মাস পরে মিসেস গান্ধী জরুরি আইন প্রত্যাহার করেন এবং নির্বাচনের ঘোষণা দেন। কারণ মিসেস গান্ধী ভেবেছিলেন তিনি আসন্ন নির্বাচনে বিজয়ী হবেন।
ইউএসএ, ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ পশ্চিমা সরকারগুলো প্রকাশ্যে এই ইমার্জেন্সির বিরুদ্ধে কোনো কথা তো বলেই নাই, উপরন্তু  ভারতে বৃহৎ পুঁজির বিনিয়োগ অব্যাহত ছিলো। সেই সাথে দেশের অভ্যন্তরের সমর্থন পেয়ে মিসেস গান্ধী ইমার্জেন্সির পক্ষে লেজিটিমেসি (Legitimacy) পেয়ে যান এবং সঞ্জয় গান্ধীর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেন। প্রায় ২০০ জন প্রার্থী সঞ্জয় গান্ধী নিজে সিলেক্ট করেন। গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু হলেও প্রশ্ন থেকেই যায়, তা কী ধরনের গণতন্ত্র?
পুরো বিষয়টাকেই লেখকগণ বর্তমান হিন্দুত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বর্তমান শাসনামলের সাথে মিলিয়ে বর্ণনা করেছেন। ‘৭০-এর দশকের শুরু থেকে ‘৮৪ সালে মিসেস গান্ধী নিহত হওয়া পর্যন্ত আইন ও বিচার বিভাগকে দুর্নীতিগ্রস্ত করা হয়, এক্সিকিউটিভ-জুডিশিয়ারি-লেজিসলেটিভের ভারসাম্য দুর্বল হয়। ১৯৭৩ সালে মিসেস গান্ধী তিন জন বিচারককে পাশ কাটিয়ে এমন একজন বিচারককে নিয়োগ দেন যিনি জরুরি আইনকে বৈধতা দিয়েছিলেন।
(৬) লেখকগণ ‘৭৫-এর ইমার্জেন্সিকে বিভিন্ন দেশের, বিশেষ করে ১৯৬৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার ডিক্টেটর জেনারেল পার্ক চুং হির (Park Chung Hee) শাসন এবং ১৯৬৫ সালে ফিলিপাইনে একনায়ক ফার্দিনান্দ মার্কোসের (Ferdinand Marcos) শাসনামলের সাথে তুলনা করেন। ১৯৭৫ সালে সঞ্জয় গান্ধী ফিলিপাইনের প্রেস সেন্সরশিপের গাইডলাইন হুবহু কপি করেছিলেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইতিহাস বিবেচনায় নিলে ভারতের ইমার্জেন্সি কোনো ব্যতিক্রম নয় এবং এই ইমার্জেন্সি একটি ব্লু-প্রিন্ট হিসেবে ব্যবহার হতে পারে বা হয়েছে।
(৭) লেখকগণ ‘৭৫-এর জরুরি আইনের ভেতর দিয়ে বর্তমান বিজেপি শাসনকে বোঝার জন্য কিছু শিক্ষণীয় বিষয় আলোচনা করেছেন:
প্রথমত: জনতুষ্টবাদী ( National Populism) রাজনীতি   থেকে কর্তৃত্ববাদী (Authoritarianism) রাজনীতির বিকাশ হয়। বস্তুত জনতুষ্টবাদী রাজনীতির অভ্যন্তরেই সুপ্ত থাকে কর্তৃত্বপরায়ণবাদ।
দ্বিতীয়ত: ভারতের জনসংখ্যার তুলনায় খুব কম সংখ্যক মানুষ কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান।
তৃতীয়ত: ব্যাবসায়িক স্বার্থে বৈদেশিক শক্তির সমর্থন সূচক ভূমিকা দিয়ে ইমার্জেন্সির সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে বর্তমান সময়কে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। যখন ভারতে মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে বিদেশী প্রভুরা নীরব । যদিও  মার্কীন রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন ভারতে মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় জো বাইডেন মোদীর শাসনের সমালোচনা করেছিলেন ।
‘৭০-এর দশকের পপুলিজম ছিলো মূলত বামপন্থী পপুলিজম। যেমন ভূমি সংস্কারের জনপ্রিয় দাবী উত্থাপন ,”গরীবি হটাও” । পার্টিকে দুর্বল করে ব্যক্তিক্ষমতা বৃদ্ধি। ইন্দিরা গান্ধীর পপুলিস্ট ক্যারিজম্যাটিক লিডারশিপ নিয়ে আগে কিছু উল্লেখ করা হয়েছে। ‘৭১-এ পাকিস্তান ভেঙে দেয়া, ‘৭৪-এ নিউক্লিয়ার টেস্ট, সিকিমকে ভারতের সাথে সংযুক্ত করা। নরেন্দ্র মোদীও তেমনই একজন পপুলিস্ট বা জনতুষ্টবাদী নেতা। ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গা, পাকিস্তানের বালাকোট (Balakot) অঞ্চলে হামলা, আর্টিকেল ৩৭০ বাতিল করে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা রহিতকরণ, অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের স্থলে রাম মন্দির নির্মাণ, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রকাশ্যে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধাচারন , বিভিন্ন রাজ্যে নারিকত্ব বিল আনা , গো হত্যা বিষয় এবং ” লাভ জিহাদ” , বিভিন্ন  মুসলিম স্থাপনাকে মন্দীর দাবী করা , বিচার বিভাগ , মিডিয়া , এনজিও , প্রতিপক্ষ দমন, আমলাতন্ত্রের উপর নিয়ন্ত্রন ,  —এসব কেবল ব্যক্তিগত ভালো বা মানবিক গুন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। একজন খলনায়কও ক্যারিজম্যাটিক হতে পারেন।  এসকলই আজ ভারতেএকজন জনতুষ্টবাদী নেতার জনপ্রিয়তার মূল কারণ হয়ে উঠেছে এবং এসবের বিরুদ্ধে বিপুল জনগোষ্ঠীর ব্যাপক সমর্থন লক্ষণীয় -ঠিক যেমনটা ছিল ‘৭৫ এ ঘোষিত জরুরী আইনের সময়  ।  সেই সময় একটা জনপ্রিয়  স্লোগান ছিল, “ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া ইজ ইন্দিরা”।  আজ ভারতের মোদী সরকারের জনতুষ্টবাদী জনপ্রিয়তার ( National populism)  দিকে নজর ফেরালে এমন স্লোগানই ধ্বনীত প্রতিধ্বনীত হয়। যেমন মহারাষ্ট্রের বিজেপি নেতৃবৃন্দ মোদীকে ” বিষ্ণুর এগারোতম অবতার” বলে উল্লেখ করেন । তবে এই জনতুষ্টবাদী কর্তৃত্বপরায়ণবাদ মৌলিকভাবে উগ্র ডানপন্থী। লেখকগন বর্তমান বিজেপি শাসিত সময়কে ‘ অঘোষিত জরুরী আইন ( Undeclared emergency) ” ,  নির্বাচনি   কর্তিত্বপরায়নতা ( electoral authoritarianism )  এবং এথনিক ডেমক্রেসি ( ethnic Democracy) বা একটি নির্দিস্ট জাতী-ধর্মসত্তার ঐতিহ্য ( tradition) ,ধর্ম , ভৌগোলিক ( পবিত্র ভূমি) ,সাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠির জন্য বলে উল্লেখ করেন । লেখকগন বর্তমান মোদী শাসনকে, ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলের মতোই  ” সুলতানী আমলের” ( Neo-Sultanism)  শাসনের সাথেই তুলনা করেছেন ।
  ভাষান্তর:  মুর্শেদুল  হাকিম (শুভ্র)। জুলাই ২০২৬
মূল লেখক ঃঃ Christophe Jaffrelot———- is a French political scientist specialising in South Asia, particularly India and Pakistan. He is a professor of South Asian politics and history the Centre d’études et de recherches internationales at Sciences Po, a professor of Indian Politics and Sociology at the India Institute of King’s College London, and a Research Director at the Centre national de la recherche scientifique.
(লেখকের ব্যক্তিগত মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের; এ জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)