চলমান সংবাদ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রন্থাগারে ঢুকে তিন শিক্ষার্থীকে পিটুনি, রাকসু ও শিবির নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে ঢুকে তিন শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় মারধরের অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) ও শাখা ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত প্রক্টর কার্যালয়, রাকসু ভবন ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। হামলায় আহত হন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আনাস ও হাসিব এবং সংস্কৃত বিভাগের মাহমুদুল হাসান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। গুরুতর আহত মাহমুদুল হাসানকে হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও তাঁকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে টেনে নামিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে।

ঘটনার সূত্রপাত

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সংস্কৃত বিভাগের এক ছাত্রী একই বিভাগের শিক্ষার্থী মহসিন আলমের বিরুদ্ধে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ভয়ভীতি প্রদর্শন, বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন করে হয়রানি এবং ক্যাম্পাস ছাড়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেন। এ ঘটনায় রোববার রাতে প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন ওই ছাত্রী।

অভিযোগের পর প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমানের কার্যালয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মহসিন আলমের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন আনাস, হাসিব ও মাহমুদুল হাসান। বৈঠকে অভিযোগ অস্বীকারের একপর্যায়ে তাঁদের সঙ্গে প্রক্টরের বাকবিতণ্ডা হয়।

প্রক্টর কার্যালয়ে প্রথম দফা মারধর

সোমবার দুপুরে একই ঘটনায় আবার বৈঠক ডাকা হলে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মারসহ কয়েকজন নেতা আনাসকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী বলে অভিযোগ করেন। এ সময় তাঁর মোবাইল ফোনে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়ে তাঁকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে এনে সবাইকে প্রক্টর কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয়।

রাকসু ভবন ও গ্রন্থাগারে সংঘর্ষ

এরপর বিকেলে রাকসু ভবনের সামনে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। রাকসু নেতাদের দাবি, আনাস, হাসিব ও মাহমুদুল তাঁদের ওপর হামলা চালান। পরে তিন শিক্ষার্থী কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে আশ্রয় নিলে রাকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা সেখানে প্রবেশ করে কাঠ, বাঁশ, রড, বেল্ট ও লাঠিসোঁটা দিয়ে তাঁদের বেধড়ক মারধর করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

হামলা ঠেকাতে এগিয়ে আসা কয়েকজন সাধারণ শিক্ষার্থীও মারধরের শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভিডিওতে হামলার দৃশ্য

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার একটি বেলচা হাতে গ্রন্থাগারের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছেন। অন্য একটি ভিডিওতে তাঁকে একটি বড় লাঠি দিয়ে এক শিক্ষার্থীকে মারধর করতে দেখা যায়। এছাড়া অ্যাম্বুলেন্স থেকে আহত শিক্ষার্থীকে টেনে নামিয়ে লাথি ও মারধরের দৃশ্যও ভিডিওতে উঠে এসেছে।

আহত শিক্ষার্থীর দাবি

আহত শিক্ষার্থী আনাস দাবি করেন, অতীতে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত বন্ধুদের সঙ্গে ছবি থাকলেও তিনি ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন না।

তিনি বলেন, “প্রক্টর অফিসে আমাকে ছাত্রলীগ ট্যাগ দিয়ে মারধর করা হয়। পরে আমরা লাইব্রেরিতে গেলে আবারও সেখানে ঢুকে আমাকে বেধড়ক পেটানো হয়। আমার শরীরে দুই শতাধিক আঘাত করা হয়েছে।”

রাকসুর বক্তব্য

রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, তাঁরা প্রক্টরের মাধ্যমে আনাসকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার দাবি জানিয়েছিলেন। তবে প্রশাসন তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার পর তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয়।

তিনি আরও দাবি করেন, “দুই বছর ধরে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সেই প্রেক্ষাপটেই আমরা সেখানে উপস্থিত হয়েছিলাম।”

শিবিরের প্রতিক্রিয়া

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান হামলায় সংগঠনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, হামলার খবর পেয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি দেখতে পান।

তবে বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে শিবির-সমর্থিত প্যানেলের কয়েকজন নির্বাচিত রাকসু নেতা এবং শিবিরের একাধিক নেতাকে হামলায় অংশ নিতে দেখা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন।

ছাত্রদলের প্রতিক্রিয়া

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, একটি ব্যক্তিগত বিরোধকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে গ্রন্থাগারের মতো শিক্ষাঙ্গনে হামলা চালানো হয়েছে। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

প্রশাসনের অবস্থান

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান জানান, ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আনাস ও হাসান নামে দুজনকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে। পুরো ঘটনার তদন্তে দ্রুত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলীম বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। প্রশাসন, পুলিশ ও প্রক্টরিয়াল বডি যৌথভাবে বিষয়টি তদন্ত করছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।