বিজন ভাবনা (৫৩): ইউক্রেন যুদ্ধ ও রাজাকার – বিজন সাহা

অনেকেই হয়তো অবাক হবেন শিরোনাম দেখে। তবে রাজাকার বলতে এখানে আমাদের পরিচিত রাজাকারদের কথা বলছি না, বলছি তাদের কথা যারা রাশিয়ায় বসে রাশিয়ার সাথে বেঈমানি করছে। কয়েক বছর আগে মস্কোর ক্রেমলিনে ইউক্রেন যখন ড্রোন হামলার চেষ্টা করে তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে কেউ মস্কো বা তার পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে এই আক্রমণ চালিয়েছে। তাছাড়া ইউক্রেনীয় ড্রোন যখন কাজান, তিউমেন ও অন্যান্য দূরবর্তী এলাকায় আঘাত হেনেছে তখন এই প্রশ্নটি আবার সামনে চলে এসেছে। এক সময় দুবনা আক্রমণকারী এক ড্রোন কালিয়াজিন থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। এমনকি কাজাখস্তান থেকেও রাশিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় এমন হামলার কথা শোনা গেছে। সরকারি ভাবে না বললেও সাধারণ মানুষ এটা বিশ্বাস করত। ইদানিং কালে বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে ও ঘটছে যা নতুন করে প্রমাণ করে যে দেশের ভেতরেও বিদেশী এজেন্ট একেবারে কম নয়।
বিগত কয়েকদিন ধরে কয়েকটি খবর এখানে প্রচার করা হয়েছে ভিডিও সহ। এর আগেও টিন এজার আর পেনশন ভুক্ত মানুষদের ইউক্রেন ব্যবহার করেছে নিজেদের কাজে। তবে এসব ক্ষেত্রে সাধারণত ওরা নিজেদের রুশ গোয়েন্দা বাহিনীর অফিসার হিসেবে পরিচয় দিত। এরকম আমার সাথেও হয়েছে। মানে নিজেকে এফএসবির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলে টেলিফোনে বিভিন্ন তথ্য জানার চেষ্টা করেছে। এখানকার বয়স্ক মানুষ, যারা এখনও সেই সোভিয়েত অতীতেই পড়ে আছে, সহজেই এসব গল্প বিশ্বাস করে এবং এই যুদ্ধে দেশকে সাহায্য করছে ভেবে ওদের ইনস্ট্রাকশনে চলতে থাকে। এভাবে অনেক সময় এরা পুলিশ ফাঁড়িতে বা এটিএম মেশিনে বোমা (অনেক সময় এরা জানত না কি আছে প্যাকেটে, তাদের হাতে কোন প্যাকেট ধরিয়ে দেয়া হত, তারা সেটা রেখে আসত) রেখে এসেছে, টিন এজাররা বাবা মার ব্যাংক কার্ড নম্বর বলে তাদের পথে বসিয়েছে। আসলে ওদিক থেকে নাম ধরে এমন ভাবে কথা বলতে শুরু করে যে অবিশ্বাস করার উপায় নেই। তাই স্বাভাবিক ভাবেই মনে হয় এরা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মানুষ। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই হয়তো কাউকে অনুরোধ করে কিছু অর্থের বিনিময়ে কারও কাছ থেকে কোন প্যাকেট কালেক্ট করে অন্য কোথাও পৌঁছে দিতে। এসব এক সময় স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। এমন ঘটনাও ঘটেছে ইনস্ট্রাকশন অনুযায়ী যখন সে সেই লোকের কাছে প্যাকেট হ্যান্ড ওভার করার আগে ফোন করেছে, রিমোটের সাহায্যে প্যাকেটে লুকানো বোমা বিস্ফোরণ করা হয়েছে। এতে শুধু তাদের টার্গেটই মারা যায়নি, সাহায্যকারী লোকও মারা গেছে। এভাবে অনেকে না জেনেই অপরাধের সাথে জড়িত হয়েছে বা বেঘোরে প্রাণ হারিয়েছে। বিভিন্ন জন বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ইউক্রেনকে সাহায্য করছে। কারো দেশপ্রেমকে কাজে লাগিয়ে দেশ বিরোধী কাজে লিপ্ত করা হয়েছে। কেউ কেউ এক পর্যায়ে বুঝতে পেরে এখানকার আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাকে জানিয়েছে, কেউ লজ্জায় বা ভয়ে (কারণ একবার কাউকে দিয়ে কোন অপরাধ করাতে পারলে তাকে সহজেই ম্যানিপুলেট করা যায়) ওদের ইনস্ট্রাকশন মেনে কাজ করে শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েছে। তবে গত সপ্তাহের ঘটনাবলী অন্য রকম।
গত শুক্রবার এফএসবি রোস্তভের মিলিটারি এয়ারপোর্ট আক্রমণের ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থার প্রচেষ্টা বানচাল করে দিয়েছে। তাদের পরিকল্পনা ছিল সেখানকার অবকাঠামো ও জনবল ধ্বংসের। এজন্য তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত বিস্ফোরক পূর্ণ ১৩ টি এফপিভি ড্রোন ব্যবহার করার কথা ছিল। কিন্তু যে রুশ লোকের সাথে ইউক্রেন থেকে যোগাযোগ করা হয় সে সাথে সাথে এখানকার সিকিউরিটি সার্ভিসকে বিষয়টি অবহিত করে। এরপর এফএসবি সেটা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। ইউক্রেন থেকে ইনস্ট্রাকশন আসে কোত্থেকে এফপিভি ড্রোন সংগ্রহ করতে হবে এবং কোন কোন জায়গায় আক্রমন চালাতে হবে। ড্রোন পাওয়ার পর প্রথমেই সেগুলো বিস্ফোরক মুক্ত করা হয়। আর যখন সন্ত্রাসী আক্রমণের জন্য প্রতিশ্রুত অর্থের ২০% হাতে আসে তখন ইউক্রেনের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এখন এই ড্রোনগুলি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হবে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য।
এছাড়া চেলিয়াবিনস্ক ও আমুর অঞ্চল আক্রমণের ইউক্রেনীয় চেষ্টা নস্যাৎ করে এফএসবি। ইউক্রেন সীমান্তবর্তী ব্রিয়ানস্ক এলাকায় এফপিভি ড্রোন তৈরির পার্টস ভর্তি কনটেইনার ফেলে দেয়। সেখান থেকে ইউক্রেনের স্থানীয় দোসররা ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন ভর্তি গাড়ির নীচে লুকিয়ে এসব রাশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যায়। তারপর এয়ারপোর্টের পাশে গ্যারেজ ভাড়া করে সেখানে ড্রোন এসেম্বলি করে আঘাত হানার জন্য প্রস্তুত হয়। অবশ্য এফএসবি প্রথম থেকেই এসবের দিকে খেয়াল রেখেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় দোসরদের কাজ করতে দিয়ে শেষ মুহূর্তে স্বাক্ষ্য প্রমাণ সহ এদের ধরা। আটককৃত স্থানীয় দোসরদের কাছ থেকে আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা ও সুইডিশ ইলেকট্রনিক যুদ্ধ-প্রতিরোধী নিউরাল নেটওয়ার্ক কন্ট্রোল মডিউল যুক্ত ২৮ টি এফপিভি ড্রোন উদ্ধার করা হয়। ড্রোনগুলোতে এক কিলোগ্রাম ওজনের বিস্ফোরক ছিল আর ছিল দুটো মোবাইল গ্রাউন্ড কন্ট্রোল সিস্টেম যা ব্যবহার করে স্যাটেলাইট, সেলুলার, ওয়াই-ফাই ও রেডিও চ্যানেলের মাধ্যমে ড্রোনগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যেত। আর ছিল আত্ম-বিধ্বংসী ডিভাইস।
গতকালের ঘটনা ঘটে মস্কোর উপকণ্ঠে। স্পেন থেকে টাইলসের সাথে আসে ড্রোন তৈরির উপাদান। স্লোভাকিয়া থেকে সেই ট্রাক পোল্যান্ড হয়ে রাশিয়ায় পৌঁছে। সীমান্তে লেজার বীম ব্যবহার করে তল্লাসী করার সময় এরা ড্রোনের উপস্থিতি টের পায়। তবে সেটা বুঝতে না দিয়ে এফএসবি টাইলস ভর্তি গাড়িটি ট্র্যাক করতে শুরু করে। উদ্দেশ্য, স্থানীয় যারা সন্ত্রাসী কাজ চালাবে তাদের গ্রেফতার করা। এরপর যুক্ত হয় মালদাভিয়ার এক কাপল। রাশিয়ায় মালদাভিয়ার লোকদের ঘরের কাজে ডিম্যান্ড আছে। তাই তারা টাইলস কালেক্ট করলে কেউ তেমন সন্দেহ করবে না। তারা সেই টাইলস সংগ্রহ করে একটি গ্যারেজে রাখে। গোয়েন্দারা আগে থেকেই সেই গ্যারেজে ক্যামেরা সেট করে রেখেছিল। এরপর মালদাভিয়ার কাপল দেশে চলে যায়। হাতের নাগালে পেয়েও তাদের চলে যেতে দেওয়া হয়। ইউক্রেনের গোয়েন্দারা চেষ্টা করে প্রচুর লোকজনকে এই চেইনে জড়িত করার যাতে সহজে খেই পাওয়া না যায়। এরপর মাঠে নামে স্থানীয় দোসর। সে সাজাপ্রাপ্ত আসামী। তবে যুদ্ধ শুরু হলে ছাড়া পায় যুদ্ধ করার জন্য। যুদ্ধ থেকে ফেরার পর ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থা তার সাথে যোগাযোগ করে। হতে পারে অপরাধ করার পুরানো অভ্যেস অথবা বিনা পরিশ্রমে কিছু কাঁচা পয়সা উপার্জনের লোভ। তার কাজ ছিল ড্রোনগুলো এসেম্বলি করে আগে থেকে নির্ধারিত কোন নির্জন জায়গায় রেখে আসা। খুব বেশি টাকা দেবে বলেনি, তবে অপারেশন শেষ ইউরোপে নেবার লোভ দেখিয়েছে। সেই লোক ৩৫ টি ড্রোন এসেম্বলি করে। উদ্দেশ্য মস্কোর বিভিন্ন এলাকায় আঘাত হানা। তবে যে মুহূর্তে সে প্রথম ড্রোনটি ক্ষেপন করেছে, সাথে সাথে সেটা সহ গ্যারেজের ভেতরেই বাকি ৩৪ টা ড্রোন ধ্বংস করা হয়।
এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে যেসব ড্রোন ইউক্রেন থেকে রাশিয়ায় আসে তার একটি বড় অংশই এখান থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় সহযোগী অথবা ট্র্যাপে পড়া মানুষের মাধ্যমে। আসলে এ এক অদ্ভুত যুদ্ধ। ইউরোপ সরাসরি যুদ্ধের মাঠে না থাকলেও যুদ্ধ মূলত তারাই করছে ইউক্রেনকে অস্ত্র, অর্থ, তথ্য, প্রযুক্তি দিয়ে। এমনকি তারা ইউক্রেনের চেয়ে বেশি আগ্রহী যুদ্ধ চালিয়ে যেতে। রাশিয়ার উপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার চেয়ে তাদের ক্ষতি করছে বেশি। আবার এত কিছুর পরেও সব রকম ব্যবসাই চলছে, হয় সরাসরি না হয় তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে। সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের জন্য বোমা বা ড্রোন তৈরির সব কম্পোনেন্ট টাইলস, ফুল, ফল ইত্যাদি অন্যান্য সাধারণ পণ্যের ভেতরে লুকিয়ে এ দেশে প্রবেশ করছে। প্রতিটি গাড়ি চেক করা সম্ভব নয়, সাধারণত কয়েকটা থেকে একটি গাড়ি চেক করে। ফলে প্রায়ই এসব অস্ত্র গন্তব্যে এসে পৌঁছে।
তবে এই ধরণের সহযোগিতা যে একমুখী ঠিক তা নয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনের পর ইউক্রেন দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। খারকভ থেকে ওডেসা পর্যন্ত সমস্ত দক্ষিণপূর্ব ইউক্রেন ছিল রুশ পন্থী, উত্তরপশ্চিম ইউক্রেন ছিল পশ্চিমা পন্থী। সমস্ত নির্বাচনের ফলাফল দেখলেই সেটা পরিষ্কার বোঝা যায়। ২০১৪ সালে ময়দানের পর ক্রিমিয়া ও দনবাসের একাংশ ইউক্রেনের হাতছাড়া হয়ে গেলে আর খারকভ ও ওডেসার রুশপন্থীদের উপর অত্যাচার নেমে এলে সমীকরণ বদলে যায়, তবে ইউক্রেনে রুশপন্থীরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। ফলে যেসব জায়গায় রুশ সেনারা যাচ্ছে সেখানে গণপ্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। তাই মনে সব সময় প্রশ্ন ছিল এরা কোথায়? এই যে রাশিয়া একের পর এক ইউক্রেনের সামরিক স্থাপনা, গোলাবারুদের গোডাউন, ড্রোন ও পশ্চিমা অস্ত্র ভাণ্ডার, পশ্চিমা ভাড়াটে সেনাদের উপর প্রায় নিখুঁত ভাবে আক্রমণ করছে, সেটা তো শুধু স্পুটনিকের মাধ্যমে তথ্য পেয়ে নয়, সেখানে রুশপন্থী মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব তথ্য পাচার করছে। আসলে যুগ যুগ ধরেই দেশে দেশে এমন ঘটে। কী শান্তির সময়ে, কী যুদ্ধ কালে এরকম লোক থাকে যারা নিজ দেশের সরকারকে সমর্থন করে না। তবে দেশ যখন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তখন এদের কাজকর্ম দেশদ্রোহিতা হিসেবে দেখা হয়। বিশেষ করে তারা যদি সরাসরি শত্রু পক্ষকে সাহায্য করে তবে আইনের সামনে তাদের জবাব দিতে হয়। রাশিয়ায় ব্যতিক্রম ঘটছে না। ইতিমধ্যে অনেকেই শাস্তি পেয়েছে, অনেকে রায়ের অপেক্ষা করছে। রাশিয়ায় মৃত্যুদণ্ড উঠিয়ে না দিলেও সেই নব্বুইয়ের দশক থেকেই রহিত। সমাজে চাহিদা আছে অন্তত সন্ত্রাসবাদী কাজের জন্য মৃত্যুদণ্ড ফিরিয়ে আনার। সরকার নারাজ। ফলে যারা ধরা পড়ছে তাদের অনেকেই দীর্ঘ মেয়াদী বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাচ্ছে।
ইউক্রেন প্রায়ই সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ চালালেও সরাসরি সেটা বলত না। গতকাল জেলেনস্কি বলেছে ইউক্রেন এখন সন্ত্রাসবাদকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের মেথড হিসেবে নেবে। তাই জাপারোঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চিফ ইঞ্জিনিয়ারকে সন্ত্রাসী হামলায় হত্যা করলেও পশ্চিমা বিশ্ব থেকে এর প্রতিবাদ শোনা যায়নি। সমস্যা হল, একবার কারও সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দিলে পরে সেটা নিজের উপরেও হতে পারে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে আল কায়েদা, ইসলামিক স্টেট এসব সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আমেরিকার অর্থে ও তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। পরে এরাই আমেরিকার উপর আঘাত হেনেছিল। মূলত রাশিয়ায় সন্ত্রাসী হামলা চালালেও ইউক্রেন ইদানীং ইউরোপে সন্ত্রাসী কাজকর্ম চালাচ্ছে। খুব বেশি দেরি হবার আগেই এসব বিষয়ে সচেতন না হলে পশ্চিমা বিশ্বকে এ জন্য অনেক বড় মূল্য দিতে হতে পারে।
গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো
