জাহাজভাঙা শিল্পে ন্যায়সঙ্গত রূপান্তরের প্রশ্ন
আজ ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস। পরিবেশ রক্ষা, টেকসই শিল্পায়ন এবং মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশ্নে বিশ্বজুড়ে যখন আলোচনা চলছে, তখন বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পের বর্তমান বাস্তবতা নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জাহাজভাঙা শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও শিল্পটির উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের সুফল শ্রমিকদের জীবনে কতটা পৌঁছেছে—সেই প্রশ্ন আজও অনুত্তরিত।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণকারী দেশ। দীর্ঘদিন ধরে এই শিল্প পরিবেশ দূষণ, শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা, কর্মক্ষেত্রের অনিরাপদ পরিবেশ এবং বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে সমালোচিত হয়ে এসেছে। এসব সমালোচনা ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৯ সাল থেকে দেশে গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড প্রতিষ্ঠার যাত্রা শুরু হয়। জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন, ২০১৮ প্রণয়ন, বিভিন্ন বিধিমালা প্রণয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কংক্রিট ফ্লোর নির্মাণ, বর্জ্য সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার শিল্পে দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তন কি ন্যায়সঙ্গত পরিবর্তন?
শিল্পের অবকাঠামো উন্নয়ন ঘটেছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের লক্ষ্যে মালিকরা বিনিয়োগ করেছেন, কয়েকটি ইয়ার্ড আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। কিন্তু একই সময়ে শ্রমিকদের জীবনমান, মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পেশাগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত উন্নয়ন ঘটেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের ওপর কাজের চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নতুন ধরনের ঝুঁকিরও সৃষ্টি হয়েছে।
জাহাজভাঙা শিল্পে কর্মরত শ্রমিকরা প্রতিদিন অ্যাসবেস্টস, ভারী ধাতু, বিষাক্ত ধূলিকণা, রাসায়নিক পদার্থ, তেল ও গ্যাসের সংস্পর্শে আসেন। এসব উপাদানের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ, চর্মরোগ, ক্যান্সারসহ নানা ধরনের পেশাগত রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়। উন্নত অবকাঠামো নির্মাণ হলেও পেশাগত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রোগ শনাক্তকরণ এবং ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।
বাংলাদেশে জাহাজভাঙা শ্রমিকদের পেশাগত রোগ সম্পর্কিত কোনো সমন্বিত জাতীয় তথ্যভান্ডার নেই। ফলে কতজন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রের কারণে অসুস্থ হচ্ছেন কিংবা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকির শিকার হচ্ছেন, তার নির্ভরযোগ্য তথ্যও পাওয়া যায় না। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মৃত্যু দৃশ্যমান হওয়ায় তা আলোচনায় আসে, কিন্তু ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া পেশাগত রোগগুলো প্রায় অদৃশ্যই থেকে যায়।
উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক গবেষণা ও ঘটনাবলি দেখাচ্ছে যে জাহাজভাঙা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এখনো অত্যন্ত গুরুতর। ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রজত রায় বিশ্বাস ২৫ জন জাহাজভাঙা শ্রমিকের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখতে পান যে প্রায় সকল শ্রমিকই বিভিন্ন ধরনের ফুসফুসজনিত রোগে আক্রান্ত। ফলে তারা অল্প পরিশ্রমেই শ্বাসকষ্টে ভোগেন, দুর্বল হয়ে পড়েন এবং স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারাতে থাকেন। এটি প্রমাণ করে যে কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ধূলিকণা, অ্যাসবেস্টস ও অন্যান্য বিষাক্ত উপাদানের প্রভাব শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
একইভাবে ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর এস.এন. কর্পোরেশন জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে সংঘটিত ভয়াবহ দুর্ঘটনায় আহত হয়ে বেঁচে যাওয়া ছয়জন শ্রমিকের চিকিৎসা-পরবর্তী পরীক্ষায় তাদের রক্তে বিভিন্ন ধরনের ভারী ধাতুর উপস্থিতি শনাক্ত হয়। এসব ধাতুর মধ্যে কিছু উপাদান মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল ও প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। এই ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনার পরিণতি নয়; বরং জাহাজভাঙা শিল্পে বিদ্যমান রাসায়নিক ও বিষাক্ত পদার্থের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাসেল কনভেনশন এবং নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে হংকং আন্তর্জাতিক কনভেনশন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করে। এই দুই কনভেনশনের মূল দর্শন হলো—পরিবেশ সুরক্ষা এবং শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়; এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে মানুষ ও পরিবেশ উভয়ের সুরক্ষা সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ঐতিহাসিক ফিলাডেলফিয়া ঘোষণা (Philadelphia Declaration, 1944) বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। এই ঘোষণায় বলা হয়েছে, “শ্রম কোনো পণ্য নয়” এবং “যেখানেই দারিদ্র্য থাকবে, সেখানেই সমগ্র বিশ্বের সমৃদ্ধি হুমকির মুখে থাকবে।” ঘোষণাটি আরও উল্লেখ করে যে, সকল মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সমান সুযোগ, মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP), আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (IMO) বারবার জোর দিয়ে বলেছে যে, নিরাপদ ও টেকসই জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে শ্রমিককে। অথচ আমাদের বাস্তবতায় গ্রিন ইয়ার্ড প্রতিষ্ঠার আলোচনায় শ্রমিকের স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, দক্ষতা উন্নয়ন এবং পেশাগত রোগ প্রতিরোধের বিষয়গুলো প্রায়ই প্রান্তিক হয়ে পড়ে।
ফিলাডেলফিয়া ঘোষণার আলোকে জাহাজভাঙা শিল্পের বর্তমান রূপান্তরকে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, শিল্পের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটলেও শ্রমিকের মানবিক ও সামাজিক অধিকার এখনো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না। একটি শিল্পকে আধুনিক বা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বলা যাবে না যদি সেই শিল্পের শ্রমিকরা পেশাগত রোগে আক্রান্ত হন, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা না পান, কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হন কিংবা অসুস্থতা ও অক্ষমতার ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকেন।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অনুযায়ী “শোভন কাজ” (Decent Work), “সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ” এবং “দায়িত্বশীল উৎপাদন ও ভোগ” নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অঙ্গীকার। তাই জাহাজভাঙা শিল্পে কেবল আন্তর্জাতিক সনদ অর্জন বা অবকাঠামো উন্নয়নকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা যথেষ্ট নয়। প্রকৃত সাফল্য তখনই অর্জিত হবে যখন একজন শ্রমিক নিরাপদে কাজ করতে পারবেন, কর্মক্ষেত্রে অসুস্থ হলে যথাযথ চিকিৎসা পাবেন, পেশাগত রোগে আক্রান্ত হলে ক্ষতিপূরণ পাবেন এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ লাভ করবেন।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের স্মরণ রাখা প্রয়োজন—পরিবেশ ও শ্রমিকের স্বার্থ পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক। একটি শিল্প তখনই সত্যিকার অর্থে সবুজ (Green) হতে পারে, যখন তা পরিবেশের পাশাপাশি মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যকেও সমান গুরুত্ব দেয়।
বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্প আজ এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনকে অবশ্যই ন্যায়সঙ্গত রূপান্তর (Just Transition) হতে হবে। অর্থাৎ পরিবেশগত উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল শ্রমিকদের কাছেও পৌঁছাতে হবে। অন্যথায় গ্রিন ইয়ার্ডের সাইনবোর্ড থাকলেও শিল্পের ভেতরে বৈষম্য, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অনিরাপত্তা থেকেই যাবে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তাই আমাদের আহ্বান—জাহাজভাঙা শিল্পকে শুধু পরিবেশবান্ধব নয়, শ্রমিকবান্ধবও করতে হবে। কারণ পরিবেশ রক্ষার সংগ্রাম এবং শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম মূলত একই সংগ্রাম—মানুষ ও পৃথিবীর ভবিষ্যৎ রক্ষার সংগ্রাম।
