বিজন ভাবনা

বিজন ভাবনা (৪৭): যাত্রী একই তরণীর

-বিজন সাহা

সোভিয়েত আমলে মস্কো ছিল মস্কোপন্থী কমিউনিস্টদের মক্কা। হজ্ব করার মতই বামপন্থীরা এখানে আসতেন লেনিনের স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলো দেখে ও স্থানীয় পার্টি নেতা ও রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের আলোচনা শুনে বিপ্লবের স্বপ্ন ও আবেগকে আরও ধারালো করতে। সমাজতন্ত্রের পতনের পর মস্কোগামী তীর্থযাত্রীদের স্রোতে ভাটা পড়ে আর একসময় তা শুকিয়ে যায়। তবে ইদানিং কালে মস্কো বিভিন্ন প্রশ্নে নিজেদের চিন্তা ভাবনা, নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি অন্যদের কাছে সরাসরি পৌঁছে দিতে আগ্রহী বিধায় বিভিন্ন ফোরামের আয়োজন করে। যদি আগে এসব ফোরামে সোভিয়েত দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করা হত তবে এখন রাশিয়া মূলত নিজেদের চিন্তা ভাবনা অন্যদের কাছে তুলে ধরে, যা নিয়ে অনেক সময় বাকবিতন্ডা হয়। নিজেদের মত চাপিয়ে দেয়া নয়, অন্যদের এ বিষয়ে অবহিত করাই মূল উদ্দেশ্য। আর এই সূত্র ধরেই দেশের বামপন্থী নেতারা এদেশে আসেন। আমরাও সুযোগ পাই দেশের পরিস্থিতি নিয়ে তাদের সাথে আলোচনা করার। এরকম এক আয়োজনে, সঠিক ভাবে বলতে গেলে রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির আয়োজিত ফ্যাসিবাদ বিরোধী এক ফোরামে যোগ দিতে সিপিবির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন মস্কো এসেছিলেন। ওর দেখা করেছি, গল্পগুজব করেছি, দেশের পরিস্থিতি নিয়ে মত বিনিময় করেছি। আমি যেহেতু সাম্প্রতিক কালে বিভিন্ন বিষয়ে সিপিবির রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করি তাই এক বন্ধু জিজ্ঞেস করল
– আপনি তো আজকাল সিপিবির খুব সমালোচনা করেন। তাহলে তাদের সাথে এত দহরমমহরম করেন কীভাবে?
– অনেক ভেবে দেখলাম সমালোচনা করলেও কাজের বেলায় সিপিবি আর আমি প্রায় একই রকম।
– মানে?
– আমি প্রতিদিন রান্না করি আর প্রতিদিন খাবার পুড়াই। পোড়া খাবার খাই। তাতে পেট ভরে কিন্তু তৃপ্তি পাই না। রান্না করি খিদে মেটাতে সেই অর্থে মিশন সফল কিন্তু অতৃপ্তি থেকে যায়।
– এর সাথে সিপিবির সম্পর্ক কি?
– ওরা স্বৈরাচার পতনের আন্দোলন করেছিল। হাসিনার পতন হয়েছে। সেদিক থেকে সফল। কিন্তু এর পরিবর্তে যা পেয়েছে তা হজম করতে পারছে না। আমার মত এসিডিটিতে ভুগছে। সেই বিবেচনায় আমরা একই নৌকার যাত্রী। বর্তমান পরিস্থিতিতে পছন্দ করি আর নাই করি নৌকা ছাড়া নদী পার হবার অন্য কোন উপায় দেখি না।

আমার এই স্ট্যাটাস অনেকের মনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই বলার চেষ্টা করেছে আওয়ামী লীগ এটাই চায়। তারা চায় বামদের লেজ ধরে বৈতরণী পার হতে। কাজ সম্পন্ন হলে আবার ব্যবহৃত টিস্যু পেপারের মত ছুঁড়ে ফেলে দেবে। তবে আওয়ামী লীগ কি চায় সেটা নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই। আমি কি চাই সেটাই বড় কথা। আমি চাই স্বৈরাচার মুক্ত, মৌলবাদ মুক্ত বাংলাদেশ। আর মৌলবাদ মুক্ত বাংলাদেশ স্বৈরাচার মুক্ত বাংলাদেশের  চেয়ে বেশি করে চাই। ‌এ প্রসঙ্গে আমার শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা বলি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, বিশেষ করে চেচনিয়া যুদ্ধের পর রুশ আর্মির মানসম্মান ছিল তলানিতে। কেউ সেখানে যেতে চাইত না। কিন্তু আর্মি সারভিস যখন বাধ্যতামূলক তাই সহজে পার পাওয়া যেত না। তবে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করত তারা নিষ্কৃতি না পেলেও পরে দায়িত্ব পালন করতে পারত। ফলে অনেকেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভর্তি হত। ছাত্ররা কেমন পড়াশুনা করে কেউ এ প্রশ্ন করলে বলতাম, “ওরা পড়াশুনা করতে চায় না, তবে আরও বেশি চায় না আর্মিতে যোগ দিতে।” আমিও স্বৈরাচার চাই না, তবে আরও বেশি করে চাই না মৌলবাদ। এ জন্য প্রয়োজনে আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাত করতে হলে করব। আমাদের বুঝতে হবে এই আঁতাত আওয়ামী লীগকে উদ্ধার করার জন্য নয়, উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে নিজেদের বের করে আনার জন্য। এক্ষেত্রে আমরা জামায়াতের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে পারি। ওরা কিন্তু বামদের সাথে আঁতাত করে  (অজান্তে, ছদ্মবেশে) সোনার বাংলা, ধনে ধান্যে পুষ্পে ভরা গান গেয়ে, লাল সবুজ পতাকা মাথায় বেঁধে, শেখ মুজিবের ছবি নিয়ে বাংলাদেশ ধ্বংস করেছে। আমাদের শত্রুরা আমাদের ব্যবহার করলে আমরা কেন সেটা পারব না? তারা আমাদের বারবার ব্যবহার করে এটা তাদের দোষ নয়, আমাদের দুর্বলতা।

আমার মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে আওয়ামী লীগ বিরোধিতা বা ভারত বিরোধিতা প্রগতিশীল আন্দোলনের সাথে কতটা যায়। কেন না এ ধরণের বিরোধিতা যা অনেক ক্ষেত্রেই অন্ধ ঘৃণার সমতুল্য, প্রতিক্রিয়াশীলতার অপর নাম। কেন? আমরা আওয়ামী লীগ বা ভারতের কোন কাজ বা কোন নীতির বিরোধিতা করতে পারি, কিন্তু আওয়ামী লীগ বিরোধিতা বা ভারত বিরোধিতা যদি আমাদের রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয় তাহলে সেটা আমাদের শক্তিশালী করে না, জামায়াত ও স্বাধীনতা বিরোধী বিভিন্ন মৌলবাদী দলকে শক্তিশালী করে। জায়নবাদের বিরোধিতা যেমন সব ইহুদিদের বিরুদ্ধে বিরোধিতা নয়, এটাও তাই। আর এ কারণেই জায়নবাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করার পরেও সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশ হিটলার কর্তৃক ইহুদি নিধনের সমালোচনা করত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকা ও বৃটেন জার্মানিকে ছোট ছোট অনেকগুলো দেশে ভাগ করতে চাইলে স্তালিন বলেছিলেন, “হিটলার আসে হিটলার যায় কিন্তু জার্মান জনগণ থেকে যায়।” আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব স্বৈরাচারী ছিল  আর এর জন্য আওয়ামী লীগের কর্মীদের কম ভোগান্তি পোহাতে হয় নাই। আমরা যে গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশের কথা বলি আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের কর্মী বাহিনীর এক বিরাট অংশ সেটা চায়। আমাদের মনে রাখতে হবে স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এটা ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনের কারণে বাংলা ভাষা স্বীকৃতি পেলে বিভিন্ন নির্বাচনে জয়লাভ  আমাদের স্বায়ত্তশাসনের পথে এগিয়ে নেয়। সেসব আন্দোলন ও আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন ছিল গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন। এর সাথে অর্থনৈতিক প্রশ্ন জড়িয়ে ছিল। তাই আমাদের আন্দোলন একই সাথে ছিল পশ্চিমা শোষণের বিরুদ্ধে জাতীয় সম্পদের ন্যায্য বন্টনের জন্য লড়াই। আর এসব লড়াই হয়েছে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব বাঙালির জন্য। তাই জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এসব আকাশ থেকে পড়া নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মস্তিষ্ক প্রসূত নয়। এসব রীতিমত দীর্ঘ লড়াইয়ে অর্জিত স্লোগান, আকাঙ্ক্ষা।

একাত্তরের আগে তো বটেই একাত্তরের পরেও কি আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ব্যতীত কোন আন্দোলন বাংলাদেশে সফল হয়েছে? এরশাদ বিরোধী আন্দোলন, শাহবাগ আন্দোলন, এমনকি চব্বিশের আন্দোলনে অনেক আওয়ামী কর্মী সমর্থক অংশগ্রহণ করেছে। তাই যারা বলেন “জামাত এবং অন্য মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই আওয়ামী লীগ লাগবে কেন? আর আওয়ামী স্বৈরাচার দেশকে ধ্বংস করলেও দেখি আপনার আপত্তি নাই! ভালই তো!” তাদের বলব আগে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস, বাংলাদেশের ইতিহাস খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তে। প্রশ্ন উঠতেই পারে যে “এক হয়ে লড়াই তো বহু হলো, এতে আওয়ামিলীগ লাভবান হতে পারে, দেশের কোন লাভ হয়নি, আর সিপিবি তো বি-টীম বদনাম নিয়ে এখন মাইক্রোস্কোপিক!” আমাদের যদি একার শক্তি থাকত তাহলে এই প্রশ্ন আসত না। আমরা তো নিজেদেরই রক্ষা করতে পারি না, সারা বছর বিভিন্ন ইস্যুতে রাজপথে থেকে আন্দোলন করি, কিন্তু ফসল অন্যের ঘরে চলে যায়। আর তাই বলি প্রয়োজনে আওয়ামী লীগের সাথে এক হয়ে লড়াই করতে হবে যেমনটি আমাদের পূর্বসূরিরা করেছিলেন একাত্তরে। যদি নিজেদের ক্ষমতা থাকত তাহলে আমি ছালা হারিয়ে আজ পথে বসত না বাম আন্দোলন। দেশের লাভ লোকসানের ব্যাপারে আশির দশকের কথা মনে পড়ে গেল। তখন পার্টি গ্রুপে আমাদের বলা হত পুঁজিবাদ যদি দেশে কলকারখানা তৈরি করে সেটা দেশের জন্য ভাল। আওয়ামী লীগের আমলে দেশে অবকাঠামো অনেক বদলে গেছে আর সেটা ভালোর দিকে। তাদের ব্যর্থতা প্রচুর, দেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য আওয়ামী লীগের দোষ আছে বলেই তো বছরের পর বছর তার সমালোচনা করেছি। কিন্তু তাদের সাফল্যকেও স্বীকৃতি দিতে হবে। একটুকু সততা না থাকলে রাজনীতি করবেন কীভাবে?

পড়ুন:  বিজন ভাবনা (৪৬): যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা     -বিজন সাহা

“স্বৈরাচারী শাসনের সময়েই মৌলবাদ পুষ্টি পায় বেশী। শেখ হাসিনার স্বৈরাচার তো দেশকেই ধ্বংস করেছে! ব্যাংকিং সেক্টর তো চোখের সামনে আওয়ামী লীগ ধ্বংস করল, তার সময়ে মুজিব বন্দনা ছাড়া সব ধরনের শিল্পচর্চা বন্ধ হল, স্কুল কলেজে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ হল, মফস্বলে কোন গানের অনুষ্ঠান করতে ডিসির পারমিশন লাগতো এবং পাওয়া যেত না। আওয়ামিলীগ বন্দনা ছাড়া দেশে বুদ্ধিজীবীতা আক্রান্ত ছিল। কওমী জননী হলেন! দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে মৌলবাদকে মোটাতাজা করলো আওয়ামী লীগ।” উপরের কথাগুলো যিনি লিখেছেন ধরে নিতেই পারি তিনি সমাজতন্ত্র, মার্ক্সবাদ এসব বিশ্বাস করেন। এই অভিযোগগুলো অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু জাহাজ যখন ডুবতে শুরু করে তখন ব্রাহ্মণ শূদ্র বিচার করতে গেলে প্রাণে বাঁচা যাবে না। ঘরে আগুন লাগলে আগে আগুন নেবাতে হয়, তারপর কে দায়ী আর কে নয় সেটা নিয়ে কথা বলতে হয়।  ভাবুন তো চার্চিল, রুজভেল্ট পুঁজিবাদী ও ঔপনিবেশিক শক্তি বলে স্তালিন তাদের সাথে হাত মিলিয়ে হিটলারের সাথে লড়াই করতে অস্বীকার করলেন। অথবা আরেক পরিস্থিতি কল্পনা করতে পারি। গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বস্তরের মানুষের ওপর স্তালিনের স্টীম রোলার চলেছে। হিটলার যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করল, জনতার সামনে সুযোগ ছিল স্তালিনের ডাকে যুদ্ধে না নামা। কিন্তু মানুষ তখন স্তালিনের উপর গোস্বা করে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। স্তালিন কোন ছোটোখাটো স্বৈরাচারী শাসক ছিলেন না, কিন্তু মানুষ বুঝেছিল হিটলার ও তার ফ্যাসিবাদ স্তালিনের একনায়কত্বের চেয়ে ভয়ঙ্কর। আর তাই আপামর জনগণ মাতৃভূমির জন্য, স্তালিনের জন্য (এই স্লোগান তারা নিজেরাই বানিয়েছিল) যুদ্ধ করেছে, দুই কোটি ৭০ লক্ষ জীবনের বিনিময়ে দেশকে তথা বিশ্বকে ফ্যাসিবাদ মুক্ত করেছে। রাজনীতিতে মান অভিমানের জায়গা নেই। সময় মত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে সেটা জাতীর জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সাথে একযোগে আন্দোলনের কথা উঠলেই স্বৈরাচারের দোসর ট্যাগ বসানো হয়। কিন্তু কেউ কি ভেবে দেখেছে তারচেয়ে শতগুণ বড় একনায়ক হয়েও ইউনুস কেন স্বৈরাচার নয়। কারণ এই ট্যাগ দেয় তারা যারা আমাদের দেশটাকে ব্যবহার করতে চায়। তারাই নেপথ্য থেকে আমাদের দিয়ে এসব কথা বলায়। এসব ট্যাগ যদি নিরপেক্ষ হত তবে অন্তর্বর্তী সরকারের মূল্যায়ন ভিন্ন হত। কথা উঠেছে বার বার একত্রে আন্দোলন করেও তার ফল আমাদের ঘরে উঠেনি, উঠে না। এটা কি আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা নাকি আমাদের? এবার তো জামাতের ঘরে গেল। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব যে স্বৈরাচারী ছিল সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমি ২০১৩ থেকেই এর বিরুদ্ধে লিখছি। আমাদের নিজেদের শক্তি নেই অবস্থা পরিবর্তন করার। তাহলে কি আওয়ামী লীগ স্বৈরাচার বলে তাদের মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনে নেব না? আওয়ামী লীগ যে নিজেই মৌলবাদকে ফ্লোর দিয়েছে সেটা তো ভালো ভাবেই জানি।

অনেক দিন দেশের বাইরে থাকায় হয়তো দেশ নিয়ে আমার আবেগ অন্যরকম। যারা আওয়ামী আমলে রাজনীতি করেছে, নির্যাতন ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছে তাদের পক্ষে আওয়ামী লীগকে ক্ষমা করা ততটা সহজ নয় যতটা সহজ আমার পক্ষে যদিও শাহবাগ আন্দোলনের করুণ পরিনতি, বিশেষ করে হেফাজতের সাথে আতাত করার পর থেকেই কঠোর সমালোচক ছিলাম যার সাক্ষী ফেসবুক আর আমার ব্লগ। আমার বিশ্বাস ছিল শাহবাগে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল সেটা থেকে বাংলাদেশ বাহাত্তরের সংবিধানে বিশ্বাসী একটি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল বিরোধী দল পেতে পারত। ২০১৩ সালে লিখেছিলাম আওয়ামী লীগের ও দেশের সামনে একটি সুবর্ণ সুযোগ এসেছে স্বাধীনতার পক্ষের একটি বিরোধী দল গঠনের। আওয়ামী লীগ নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে আমাদের ছাড় দেয়নি। তবে শেখ হাসিনার পতন ও পরবর্তী পরিস্থিতি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই দুই দল সম্পর্কেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, মৌলবাদী শক্তির উত্থান ও বাম জোটের দুর্বলতা থেকে মনে হয়েছে এই দুটো দল সব ভুলত্রুটির পরেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপরিহার্য। ভুলে গেলে চলবে না যে অন্ধ প্রেম আর অন্ধ ঘৃণা দুটোই সমান ক্ষতিকর।

যতদূর জানি বাংলাদেশে দিন দিন আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ইউনুসের শাসন এতটাই খারাপ ছিল যে জনগণ আওয়ামী স্বৈরাচারের ভুলত্রুটি সব ভুলে গেছে। একথা এখন এমনকি প্রচণ্ড আওয়ামী লীগ বিরোধীরাও বিশ্বাস করে। তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুর পরে ঢাকায় জানাজা করতে না দিলেও ভোলায় মানুষের ঢল নেমেছে। কিন্তু এর পরেও বামপন্থীরা আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিবাদী বলে মুখে ফেনা তুলছে, আর এই সুযোগে বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন দেশ বিরোধী চুক্তি করছে, কোরবানির বাজারে গরু বিক্রির মত দেশ বিক্রি করছে। সবাই মিলে এসব কাজের বিরোধিতা না করে বামেরা আছে আওয়ামী লীগের স্বৈরাচার খুঁজতে। বামেরা সবসময়ই জনবিচ্ছিন্ন ছিল, কিন্তু বর্তমানে সেই পুরান বয়ান নিয়ে রাজনীতি করে তারা বুঝিয়ে দিচ্ছে তারা শুধু জনবিচ্ছিন্নই নয় জামাত শিবিরের ইউজফুল ইডিয়টস। অবশ্যই দুর্জনের বিরোধিতা করতে হয়, তবে সেটা করতে হয় বুদ্ধি দিয়ে, মাথা খাটিয়ে। এক সময় সিপিবি, ছাত্র ইউনিয়ন – এরা রাজনীতির ভাল বিশ্লেষক বলে পরিচিত ছিল, কিন্তু এখন তারা জামাত শিবিরের কাছে রণকৌশলের প্রশ্নেই গোহারা হারছে।

আওয়ামী লীগের সাথে কাজ করে আমরা বারবার হেরে গেছি – এই অভিযোগ অনেকেই করে। কিন্তু আওয়ামী লীগের সাথে ঐক্যবদ্ধ কাজ করেই কি আমরা ভাষা আন্দোলনে জয়লাভ করিনি? অথবা পাকিস্তান আমলের বিভিন্ন আন্দোলনে সাফল্য পাইনি? এমনকি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় এসেছে আওয়ামী লীগের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে যুদ্ধ করেই? মুক্তিজুদ্ধে বিজয়ই কি আমাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জয় নয়? এমনকি আশির দশকে পার্টি যখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিল – সেটাও সম্ভব হয়েছিল আওয়ামী লীগের সাথে যৌথভাবে আন্দোলন করে। সবচেয়ে বড় কথা বাংলাদেশে সুস্থ রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে হলে আওয়ামী লীগের কোটি কোটি কর্মী সমর্থককে বাদ দিয়ে সেটা করা যাবে না। যতটা না আওয়ামী লীগের জন্য তারচেয়ে বেশি করে বাংলাদেশের জন্যই আওয়ামী লীগ সহ সব দলের রাজনীতি করার অধিকার নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো