যুক্তরাষ্ট্র–কিউবা উত্তেজনা: যুদ্ধের আশঙ্কায় ‘জনযুদ্ধ’ প্রস্তুতি নিচ্ছে হাভানা
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বৈরিতা নতুন করে তীব্র হয়ে উঠেছে Cuba ও United States–এর মধ্যে। সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের আশঙ্কায় এখন নিজেদের ঐতিহাসিক ‘ওয়ার অব অল পিপল’ বা ‘জনযুদ্ধ’ নীতিকে সামনে এনে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার করছে হাভানা।
সম্প্রতি কিউবার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ ‘সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সুরক্ষায় পারিবারিক নির্দেশিকা’ প্রকাশ করেছে। এতে সম্ভাব্য হামলার সময় পরিবার ও সাধারণ নাগরিকদের করণীয় বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। নির্দেশিকাটি প্রকাশের পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump প্রশাসনের কড়া অবস্থান এবং কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট Raúl Castro–এর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অভিযোগ গঠনকে।
১৯৯৬ সালে কিউবার যুদ্ধবিমান দেশটির নির্বাসিতদের পরিচালিত দুটি উড়োজাহাজ ভূপাতিত করার ঘটনায় তিন মার্কিন নাগরিকসহ চারজন নিহত হন। সেই ঘটনায় রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্র ও বিমান ধ্বংসের অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কৌঁসুলিরা। এর ফলে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে উত্তেজনার চূড়ায় পৌঁছেছে।
যুক্তরাজ্যের University of Glasgow–এর অধ্যাপক ও বিশ্লেষক Helen Yaffe বলেন, কিউবার প্রতিরক্ষা দর্শন মূলত জনগণকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তাঁর ভাষায়, “কিউবার প্রত্যেক নাগরিক কোনো না কোনোভাবে জাতীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অংশ।”
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিউবা ‘ওয়ার অব অল পিপল’ নীতি গ্রহণ করে। এই নীতির আওতায় গেরিলা যুদ্ধ, স্থানীয় মিলিশিয়া ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিদেশি হামলা মোকাবিলার পরিকল্পনা করা হয়।
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী Marco Rubio কিউবাকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য “উল্লেখযোগ্য হুমকি” বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর দাবি, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে কিউবা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে।
অন্যদিকে কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী Bruno Rodríguez Parrilla যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যকে “মিথ্যা ও যুদ্ধ উসকে দেওয়ার চেষ্টা” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, সামরিক আগ্রাসন হলে উভয় দেশের মানুষের রক্তপাত ঘটবে।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, Venezuela–তে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করেছিল, কিউবার ক্ষেত্রেও তেমন কোনো কৌশল নেওয়া হতে পারে। তবে বিশ্লেষক হেলেন ইয়াফের মতে, “ভেনেজুয়েলা মডেল কিউবায় কাজ করবে না। কারণ, এখানে জনগণ সংঘবদ্ধ এবং দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিয়ে আছে।”
স্পেনভিত্তিক Elcano Royal Institute–এর বিশ্লেষক Carlos Malamud মনে করেন, কিউবার সেনাবাহিনী ভেনেজুয়েলার তুলনায় বেশি প্রশিক্ষিত ও সুসংগঠিত। তবে Florida International University–এর কিউবান স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের পরিচালক Sebastian Arcos ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তাঁর মতে, কিউবার সামরিক শক্তি পুরোনো ও সীমিত।
সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম Axios দাবি করেছে, কিউবা ৩০০ সামরিক ড্রোন সংগ্রহ করেছে এবং গুয়ান্তানামো বে–এর মার্কিন নৌঘাঁটিতে হামলার পরিকল্পনা করছে। তবে কিউবা এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, এটি সম্ভাব্য আগ্রাসনের অজুহাত তৈরির প্রচেষ্টা।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক সংঘাতের বাইরে রাজনৈতিক ও মানবিক বাস্তবতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। কিউবায় হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন অভিবাসন সংকট তৈরি হতে পারে, যা মার্কিন রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে।
বর্তমানে গভীর অর্থনৈতিক সংকট, জ্বালানিসংকট ও দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মধ্যেও কিউবা নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। রাজধানী Havana–জুড়ে এখনো একটি স্লোগান শোনা যায়—“নো সে রিন্দে নাদিয়ে”, অর্থাৎ “এখানে কেউ আত্মসমর্পণ করে না।”

